আওয়ামী লীগে তিন বড় ধাক্কা

প্রকাশিত: ১:২১ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৬, ২০২০

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ৩ নক্ষত্রের পতন হলো। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও ১৪ দলের মুখপাত্র মো. নাসিম, আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেট সিটির সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান।

এই তিন নক্ষত্র তাদের স্বীয় কর্মের মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকা এবং জাতীয়ভাবে সকলের কাছে পরিচিত।
মাত্র তিন চাদিনের ব্যবধানে তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির (রাজনীতিবিদ) মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে যেমন শোক চলছে তেমনি আবার আতঙ্কও বিরাজ করছে। বিশেষ করে করোনা সংক্রমণ নিয়ে আতঙ্ক তাদের।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম গত শনিবার (১৩ জুন) বেলা ১১টা ১০ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলী বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন চিকিৎসাধীন অবস্থায়।মৃত্যুকালে মোহাম্মদ নাসিমের বয়স ছিল ৭২ বছর। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে নাসিম করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর হঠাৎ করে নাসিমের ব্রেইন হেমোরেজ (মস্তিকে রক্ষক্ষরণ) হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার সার্জারি করা হয়। ৮দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে চিরদিনের মতো পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক।

রোববার (১৪ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় বনানী কবরস্থান মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় মোহাম্মদ নাসিমকে। জানাজা শেষে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এখন মায়ের পাশে চিরনিদ্রায় আ’লীগের এই নেতা।

সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে মোট ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ নেন। তিনি খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এর আগে ১৯৯৬ সালে সরকারে স্বরাষ্ট্র, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন নাসিম। সর্বশেষ তিনি ১৪ দলীয় মহাজোটের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

গত শনিবার আরেক আওয়ামীলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, দলের সাবেক ধর্মবিষয়ক সম্পাদক, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আবদুল্লাহ রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে হৃদরোগ আক্রান্তে মৃত্যুবরণ করেন।

এর আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাত ১০টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) আইসিউতে ভর্তি করা হয় আবদুল্লাহকে। মৃত্যুর পর জানা যায়, করোনা পজিটিভ ছিল ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর।

শেখ মো. আবদুল্লাহ ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে ব্যস্ততার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৭ মে তার নির্বাচনী এলাকার (টুঙ্গীপাড়া-কোটালীপাড়া) উন্নয়নে প্রতিনিধির দায়িত্ব দেন তাকে।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আবদুল্লাহ ১৯৪৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার মধুমতী নদীর তীরবর্তী কেকানিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধার্মিক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

গত রোববার বাদ আসর জানাজা শেষে প্রতিমন্ত্রীর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা কেকানিয়ার পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আগে বাড়ির মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রয়াতের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

শেখ মো. আবদুল্লাহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। খুলনার আযম খান কমার্স কলেজে প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন।

১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে রাজনীতিতে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হন। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে তিনি আওয়ামী যুবলীগে যোগদান করেন।

এ সময় শেখ মো. আবদুল্লাহ বঙ্গবন্ধুর সরাসরি তত্ত্বাবধানে গঠিত গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী যুবলীগের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত হয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট মুজিব বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

তিনি ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশসেবা করার লক্ষ্যে চাকরির পরিবর্তে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং তার নেতৃত্বে রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এরপর কাউন্সিলের মাধ্যমে গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

আওয়ামী লীগের অপর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান সোমবার (১৫ জুন) ভোর ৩টার দিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর।

গত ৫ জুন করোনা আক্রান্ত হয়ে বাসায় আইসোলেশনে ছিলেন কামরান। শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি হলে গশনিবার (৬ জুন) তাকে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি করা হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে রোববার সন্ধ্যায় তাকে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল থেকে বিমানবাহিনীর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেয়া হয়। পরের দিন ৮ জুন কামরানকে সিএমএইচে তাকে প্লাজমা থেরাপি দেয়া হয়।

তাকে প্লাজমা থেরাপির পর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। তবে তাকে সিএমএইচের আইসিইউতে রেখে অক্সিজেন সাপোর্টে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। রোববার রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং সোমবার ভোর রাত ৩টায় তিনি মারা যান।

বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের স্ত্রী সিলেট মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসমা কামরানও করোনা আক্রান্ত হয়ে ২৭ মে থেকে বাসায় আইসোলেশনে আছেন। আসমা কামরান সুস্থ হওয়ার পথে রয়েছেন।

এদিকে ক‌রোনা (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে চি‌কিৎসাধীন রয়েছেন দুই মন্ত্রী। জানা গেছে, তারা এখন ভালো আছেন।

এদিকে রাজধানী ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রী লায়লা আরজুমান্দ বানু এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের শারীরিক অবস্থা আগের তুলনায় ভালো।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও তার স্ত্রীর শারীরিকঅবস্থা সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা সুফি আব্দুল্লাহিল মারুফ জানান, ওনারা স্ট্যাবল (স্থিতিশীল অবস্থায়) আছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন জানান, মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং আগের চেয়ে ভালো আছেন। তিনি যে অবস্থায় ভর্তি হয়েছেন, সেই অবস্থা থেকে তার বেশ উন্নতি হয়েছে।


মো. আলমগীর হোসেন
বার্তা সম্পাদক: ভুলুয়া বাংলাদেশ
infoalam.bd82@gmail.com