ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি একটা নেশা!

প্রকাশিত: ১০:০০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০২০

বড় বড় ব্যবসায়ীরা কেনো ঋণখেলাপি হয়? এর পেছনে শুধুই কী অর্থনীতির হিসেব কাজ করে নাকি মনস্তাত্বিক কোনো ব্যাখ্যা আছে? সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ রেফারেন্স সহকারে মন্তব্য করেছেন, বিষয়টি মনস্তাত্বিকও। এই ধরনের ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ছাড়া শুধু আর্থিক খাতের সংস্কার দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান মিলবে না।

এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। পাঠকদের জন্য সেটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

“মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজনা নিয়ে ইদানীংকালের গবেষণার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে মানুষের অর্থনৈতিক আচরণের বিষয়ে কিছু নতুন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। এর উপর ভিত্তি করে নিওরো-ইকনোমিকস (neuroeconomics) বলে অর্থনীতির একটা নতুন ধারার গবেষণা ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে।

দেখা গেছে মানুষের ভাবাবেগ, যা মস্তিষ্কের সামনের অংশের স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে, তা অনেক সময়েই পেছনের অংশের যুক্তিনির্ভর অংশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর ফলে, অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে মানুষের অর্থনৈতিক আচরণকে যুক্তিভিত্তিক বলে যে অনুমান করা হয় বাস্তবে আবেগতাড়িত হয়ে মানুষ অনেক সময়েই তেমন আচরণ করে না।

যেমন অতিরিক্ত আর্থিক লোভ কি করে অযৌক্তিক ঝুঁকি নিতে মানুষকে প্রলোভিত করে, তা দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির আর্থিক খাত এবং শেয়ার বাজারের বড় বড় ধ্বসের ঘটনা গুলোর ব্যখ্যা করা যায়।

তবে যে কারণে এ প্রসঙ্গটির অবতারণা, তা হলো নিয়রো-সাইকোলজির গবেষণার একটা চমকপ্রদ নতুন ফলাফল। অপ্রত্যাশিত নতুন নতুন অর্থ প্রাপ্তি স্নায়ুতন্ত্রের যে বিশেষ অংশকে উত্তেজিত করে, মাদক আসক্তিও সেই অংশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ধারণা করা হচ্ছে এ ধরণের অর্থ প্রাপ্তির লোভ এমনকি কোকেইন বা এ ধরণের মাদক সেবনের নেশার মত মারাত্মক হয়ে যেতে পারে।

নেশাগ্রন্থ মানুষকে আইন কানুন দিয়ে বা উপদেশ-পরামর্শ দিয়ে সংশোধন করা যায় না, প্রয়োজন তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। তাছাড়া নেশাগ্রস্থ মানুষ অন্যদেরকেও প্ররোচিত করতে পারে। (সূত্র: “Your Money and Your Brain: How the New Science of Neuroeconomics Can Help Make You Rich,” author Jason Zweig)

আমাদের ব্যাঙ্কিং খাতের ইচ্ছাকৃত ঋণ-খেলাপীরা কেনো বার একই কাজ করেন বা এ খাতের অন্যান্য লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের কেনো নিবৃত্ত করা কঠিন তার অন্ততঃ একটা আংশিক উত্তর উপরোক্ত গবেষণা থেকে মিলতে পারে। তার অর্থ, ইতিমধ্যে এভাবে আসক্ত হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ছাড়া শুধু আর্থিক খাতের সংস্কার দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান মিলবে না।

তবে বৈধ পথে মুনাফা অর্জনের নেশা সফল উদ্যোক্তা তৈরীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় বড় বড় শিল্পপতিরা অগাধ ধন সম্পদের মালিক হয়েও যে আরো মুনাফা অর্জনের নেশায় সর্বক্ষণ তাড়িত হন, বিগত শতাব্দীর বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ সুম্পুটার একে এক ধরণের জৈবিক তাড়না বা animal spirit বলে অভিহিত করেছিলেন। আধুনিক নিওরোসায়েন্সের গবেষণা থেকে এখন এর আরও বিজ্ঞানসম্মত ব্যখ্যা পাওয়া গেলো।”


লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।