ইমামের গলায় জুতার মালা!

প্রকাশিত: ১:০৩ অপরাহ্ণ, জুন ৪, ২০২০

বরিশাল সংবাদদাতা: এক মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার অফিস সহকারীকে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাত করার অভিযোগে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হয়েছে।

গত বুধবার (০৩ জুন) মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার দড়িচর খাজুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার দড়িচর খাজুরিয়া দাখিল মাদ্রাসার অফিস সহকারী এবং কাম কম্পিউটার অপারেটর শহিদুল ইসলাম নামে এই ব্যক্তিকে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে তাকে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানোর আদেশ দেয়া হয়।

এরপর তাকে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হয়েছে। আর এই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। লাঞ্ছনার শিকার শহিদুল ইসলাম উপজেলার স্টিমারঘাটের অদূরে সিকদার বাড়ি মসজিদের ইমাম।

সূত্রমতে, দড়িচর খাজুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তফা রাঢ়ির নির্দেশে তার কার্যালয়ে সালিশ বসানো হয়। এ সময় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বর) শহিদুল ইসলাম, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বর) মো. ফিরোজ, বজলু আকন, আবুল বয়াতী, মো. কামরুজ্জমান, রিন্টু দেওয়ানসহ বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষক জানান, ২০১৯ সালে উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মোবাইল হিসাব নম্বর পাঠানো হয়। তালিকা পাঠানোর সময় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মাদ্রাসায় না আসায় সেখানে শহিদুল ইসলাম তার নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে দেন। সম্প্রতি ওই ছাত্রীর এক বছরের উপবৃত্তির ১ হাজার ৮’শ টাকা মোবাইল নম্বরে জমা হয়।

এ বিষয়টি শহিদুল ইসলাম ওই ছাত্রীর অভিভাবককে জানাতে ভুলে যান। পরে এ ঘটনা জানাজানি হলে ওই ছাত্রীর বাবা ৩০ মে মাদ্রাসায় এসে শহিদুল ইসলামকে মারধর করেন এবং তার মোবাইলের সিমটি নিয়ে যান।

এ বিষয়টি দড়িচড় খাজুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তফা রাঢ়ি জানতে পেরে সালিশের নির্দেশ দেন।

বুধবার সকাল ১০টার দিকে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে সালিশ বৈঠক বসে। সালিশ বৈঠকে উপস্থিত হলে শহিদুল ইসলামকে অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়া হয়। এরপর জুতার মালা পরিয়ে স্টিমারঘাট বাজারে ঘোরানো হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, শহিদুল ইসলামের গলায় জুতার মালা পরান ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা রাঢ়ি। ওই সময় চেয়ারম্যানকে পাশে দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে দেখা যায়। পরে তার নির্দেশমতে ইমামের মাথার টুপিও খুলে নেয়া হয়। চেয়ারম্যান মোস্তফা রাঢ়িকে অশ্লীল কথা বলতেও শোনা গেছে ভিডিওতে।

দড়িচর খাজুরিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার আনিসুর রহমান বলেন, শুনেছি চেয়ারম্যান মোস্তফা রাঢ়ির নির্দেশে শহিদুল ইসলামকে জুতার মালা পরিয়ে স্টিমারঘাট বাজার এলাকা ঘোরানো হয়েছে। এটা উচিত না,শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে বিষয়টি মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারতেন তারা।

ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম বলেন, ওই ছাত্রীর উপবৃত্তির টাকা যে সিমে এসেছে, সেই সিমটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। আর অফিসে নানা কাজের চাপে বিষয়টি মনেও ছিল না। কিন্তু এত ছোট একটি বিষয় নিয়ে এত কিছু হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি।

তিনি বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে কেউ কোনোদিন অভিযোগ করতে পারেনি। কিন্তু সামান্য এ ভুলের জন্য যে অবিচার আমার ওপর করা হয়েছে তাদের বিচার আল্লাহ করবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার পীযুষ চন্দ্র দে বলেন, রাতে ঘটনাটি জানতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রতক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে রিপোর্ট দিতে বলেছি।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার তপন কুমার দাস বলেন, উপবৃত্তির টাকা নিয়ে যাই হোক, তার বিচারের এখতিয়ার ইউপি চেয়ারম্যানের নেই। যা ঘটেছে তা লজ্জাজনক।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান মোস্তফা রাঢ়ি জানান, শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। তিনি দুই ছাত্রীর উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া তিনি একটি ইনস্যুরেন্স কোম্পনিতে চাকরি করেন।

অভিযোগ আছে কয়েকগুণ টাকা মুনাফা দেয়ার কথা বলে তিনি লোকজনদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার এসব কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি সালিশ বৈঠক করেছেন। সালিশ বৈঠকে তাকে ওই সব টাকা ফিরিয়ে দিতে বলা হয়। তিনি অপারগতা প্রকাশ করে নিজেই জুতার মালা পরেছেন।

মেহেন্দিগঞ্জ থানার সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) সুকুমার রায় বলেন, ইমামকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় একজন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

ভুলুয়া বাংলাদেশ/এএইচ