এমপি পাপুলের সাথে জড়িত সন্দেহে ১৮ জন আটক

প্রকাশিত: ৩:৩১ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০২০

মানব ও অর্থ পাচারের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে কুয়েতের সিআইডি পুলিশ। গত রাত (৯ জুন) পর্যন্ত কুয়েতের বিভিন্ন প্রান্তে হানা দিয়ে মোট ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে।

এর মধ্যে ১২ জন কুয়েতী ও ৬ জন বাংলাদেশি। আটক বাংলাদেশিরা এমপি পাপুলের মালিকানাধীন মারাফির বিভিন্ন পদে নিয়োজিত ছিলেন।

অন্যদিকে ১২ জন কুয়েতী নাগরিককে এই অপকর্মের সহযোগী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আটককৃত সবাইকে ডিটেনশন সেন্টারে জিজ্ঞেসাবাদের জন্য রাখা হয়েছে। তাদেরকে সেখানে আটক এমপি কাজি শহীদ ইসলাম পাপুলের মুখোমুখি করা হবে।

কুয়েতের বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রমতে, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ কাহী শহীদুল ইসলাম পাপুলের আটকের ঘটনায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাসের কিছু কর্মকর্তা কর্মচারীদের ভিতরে।

জানা গেছে, তারা নগদ মাসোহারা এবং আত্মীয় স্বজনকে মারাফিতে চাকরির বিনিময়ে নানাভাবে এমপি পাপুলকে সহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কুয়েত কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় এনেছে। এজন্য কুয়েত দূতাবাস তদন্ত কাজে হস্তক্ষেপ করবে না বলে রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে।

উল্লেখ্য; কুয়েতের আরবি দৈনিক আল রাই জানিয়েছে, পাপুলের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে পাচারের তথ্যও এসেছে গোয়েন্দা সংস্থার হাতে।

এ কারণেই নিবিড় তদন্তের স্বার্থে পাপুলকে তদন্তকালীন পুরো সময় আটক রাখার ব্যাপারে অবস্থান নেয় গোয়েন্দা সংস্থা। পাপুলের মাধ্যমে কুয়েত যাওয়া নিয়ে প্রতারণার শিকার প্রবাসীরা ফেসবুকে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তারা দেশেও এমপি পাপুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন।

প্রবাসী সূত্রগুলো জানায়, কুয়েতে পাপুলের মালিকানাধীন ছয়টি কোম্পানি রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলে এসব কোম্পানি বাজেয়াপ্ত হতে পারে।

তারা বলছেন, অবৈধ সম্পদ রক্ষার জন্যই পাপুলের দরকার ছিল কূটনৈতিক পাসপোর্টের।

কুয়েতের আরবি দৈনিক আল রাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশি ধনাঢ্য ব্যক্তি’ পাপুল কুয়েতে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি কুয়েতি দিনার (এক হাজার ৫১৮ কোটি টাকা) হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অপরাধ তদন্ত সংস্থা তথ্য পেয়েছে।

এই অর্থের একটা বড় অংশ তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে পাচার করেছেন বলেও অপরাধ তদন্ত সংস্থার কাছে তথ্য এসেছে। পাপুলকে আটকের পর এ বিষয়টি নিয়েই নিবিড় তদন্ত চলছে। এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তার বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের বিলাসবহুল গাড়ি ঘুষ দেওয়ার অভিযোগের তদন্তও চলছে।

কুয়েতে পাপুলের সাম্রাজ্য

কুয়েতে প্রবাসীদের সূত্র জানায়, সেখানে এমপি পাপুলের মালিকানাধীন ছয়টি কোম্পানি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-

মারাফিয়া কুয়েতিয়া গ্রুপ, মারাফিয়া কুয়েতিয়া প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, মারাফিয়া কুয়েতিয়া ট্রেডিং অ্যান্ড কনট্রাকটিং, মারাফিয়া সিটি লিংকস ট্রাভেল এজেন্ট, মারাফিয়া সিকিউরিটি অ্যান্ড আইটি সল্যুউশনস এবং মারাফিয়া ইন্টারন্যাশনাল মানি এক্সচেঞ্জ।

ত্যমতে,১৯৯৩ সালে একটি কোম্পানির কনভারজেন্সি সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি শুরু করা পাপুল ১৯৯৮ সালে নিজের ক্লিনিং ব্যবসা শুরু করেন। পরে এর নাম দেন মারফিয়া কুয়েতিয়া। তবে তার অর্থ উপার্জনের সব পথ বৈধ ছিল না।

বিশেষ করে তার প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে বিনা বেতনে লোক খাটানোসহ মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায় অবৈধ উপায়ের কিছু ঘটনা প্রকাশ পেতে শুরু করলে এক পর্যায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন তিনি।

সূত্র জানায়, অবৈধ সম্পদ রক্ষার জন্যই তার দরকার হয় একটি কূটনৈতিক পাসপোর্টের। এমপি পাপুল ওয়ার্ক পারমিট নিয়েই কুয়েতে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। তিনি কুয়েতের স্থায়ী নাগরিকত্ব নেননি।

এ কারণে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী হলে তিনি কুয়েতে ‘ডিপ্লোম্যাটিক সুবিধা’ পাবেন, এ চিন্তা থেকেই মূলত তিনি যে কোনো মূল্যে এমপি হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এ কারণেই  একাদশ জাতীয় নির্বাচনে লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগের একটা বড় অংশের সমর্থন পান। তবে তিনি নির্বাচন করেন স্বতন্ত্র হিসেবে।

ঢাকা ও কুয়েতের কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এমপি পাপুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মাত্রা গুরুতর। এই অবস্থায় বিবেচনাতেই যতদিন প্রয়োজন ততদিন রিমান্ডে রাখার অনুমতি দিয়েছে স্থানীয় আদালত। তাই এমপি পাপুলের পক্ষে তার আইনজীবী ও কুয়েতি পার্টনার জামিনের আবেদন করলেও তা রাখা হয়নি।

দেশটির আইন অনুযায়ী কুয়েতে অর্থ ও মানবাপাচার বড় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কুয়েতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কি সাজা হবে পাপুলের। কুয়েতের ২০১৭ সালের এক মামলার রায়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়।

দেশটির আইন অনুযায়ী অর্থপাচার প্রমাণিত হলে ৭ বছরের সাজা হবে পাপুলের। সেই সাথে মানবপাচার প্রমাণিত হলে সাজা হবে ১৫ বছর। আর সেক্সুয়াল মানবপাচার প্রমাণিত হলে সাজা হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

 

ভুলুয়া বাংলাদেশ/এমএএইচ