ফাইল: ছবি

করোনায় (কোভিড-১৯) থমকে গেছে পুরো জনজীবন

প্রকাশিত: ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

বিষাদময় লাগছে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রোনিক্স মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া। আসছে একের পর এক মৃত্যু সংবাদ।বিভিন্ন উপসর্গে মৃত্যু সংবাদের পাশাপাশি আসছে সড়ক দুর্ঘটনা। এমনকি লঞ্চ ডুবিতে মৃত্যুর সংবাদ। দেশটা যেনো মৃত্যুপুরি। থমকে গেছে পুরো জনজীবন। প্রকট আকার ধারণ করেছে কোভিড১৯।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমগ্র বিশ্বে চরম আতঙ্কের নাম হলো করোনাভাইরাস (কোভিড১৯)। বৈশ্বিক এ মহামারি আজ আমাদের জনজীবন শুধু বিপর্যস্তই করেনি, করেছে নির্দয় ও নিষ্ঠুর। ব্যবধান রচিত হয়েছে আমাদের পারিবারিক সামাজিক ও আত্মিক সম্পর্কে।

অজানা এক আতঙ্কে দিন কাটছে বিশ্ববাসীর। অদৃশ্য এক ক্ষুদ্র ভাইরাস যা দেখা যায় না, অথচ লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে মানবজীবন। পর হয়ে যাচ্ছে আপন মানুষগুলো।

মৃত মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান-স্বামীর মৃত্যুর পর দাফন কাফন বা ছুঁয়ে দেখা তো দূরের কথা, দূর থেকেও দেখতে যায় না স্বজনরা। কি এক নির্মম নিষ্ঠুর পরিবেশে দিন কাটছে আমাদের, ভাবতেই শরীর শিওরে ওঠে।

বৈশ্বিক এ মহামারিতে অর্থনৈতিক ধ্বসে নেমেছে পুরো বিশ্বে। ঔষধ এবং খাদ্যদ্রব্য ব্যবসা ব্যতীত প্রায় সকল ব্যবসাতেই ধ্বস নেমেছে ভয়াবহভাবে। পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান থমকে গেছে। রপ্তানি বন্ধই বলা চলে। অথচ বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের অন্যতম মাধ্যম এটি।

দেশিয় পোশাক শিল্প ও তাঁত শিল্পের অবস্থাও নাজুক। কোনোমতে উৎপাদন হলেও ক্রেতা কোথায়? যেখানে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন যোগানই দায় হয়ে পড়েছে অসংখ্য লোকের, সেখানে প্রয়োজনীয় পোশাকই বা কিনবে কি দিয়ে? চাকরি হারাচ্ছে অনেক পোশাক শ্রমিক। যাদের চাকুরি আছে তাদের বেতন অনিশ্চিত। অন্যান্য শিল্প বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা তো আরো নাজুক।

এ দেশের লক্ষ লক্ষ লোক জীবীকা নির্বাহ করে বিভিন্ন দোকান ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ক্ষুদ্র ও মাঝারীমানের অনেক দোকান ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবার পথে।গত কয়েক মাস লোকসান দিয়ে তারা তন্তুহারা। দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, নিজের সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফলে কেউ কেউ ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন। কেউ বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু রাখলেও লোকবল কমাচ্ছেন। ফলে ব্যাপক হারে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই বেতন দিচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ বা ৭০ শতাংশ। সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে অধিকাংশের। কাটছে মানবেতর জীবন।

ব্যাংকগুলোর অবস্থা ভালো ঠেকছে না। গত কয়েক মাসের অর্থনীতির মন্দার প্রভাব পড়ছে তাদের ওপরেও। লেনদেন কমে যাচ্ছে, নতুন আমানত বাড়ছে না। সঞ্চয় উঠিয়ে নিয়ে খাচ্ছেন গ্রাহকরা। বৈদেশিক মুদ্রাও আসা কমেছে।

কারণ, করোনার (কোভিড-১৯) কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারিয়ে বিদেশে বেকার বসে আছে। আয় নেই, টাকা পাঠাবে কোত্থেকে? শুনা যাচ্ছে কিছু কিছু ব্যাংক তাদের লোকবল কমাবে।এখানেও বাড়ছে বেকারের সংখ্যা।

প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেক্ট্রোনিক্স মিডিয়ার অবস্থাও ভালো না।ব্যবসা বাণিজ্যের অবস্থা খারাপের কারণে দিন দিন কমে গেছে বিজ্ঞাপন। লকডাউনের কারণে অনেক জায়গায়ই পত্রিকা যায় না। ফলে সার্কুলেশন কমে যাচ্ছে। বাড়ছে এখানেও বেকারের সংখ্যা।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে যারা ছুটিতে এসে দেশে আটকা পড়ছেন, তারাও অনেকেই যেতে পারবে না। উপরন্তু যারা বিদেশে আছে তারাও অনেকে ফেরত আসতে হবে। যার ফলে অস্বাভাবিকভাবে বাড়বে, বাড়বে কি, বেড়ে গেছে বেকারের সংখ্যা। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার সিংহভাগ এসেছে বিদেশে শ্রম বিনিয়োগের কারণে।সেখানটাতে নেমে এসেছে ভয়াবহ ধ্বস।

করোনার (কোভিড-১৯) এই ভয়াবহতার কারণে কৃষির ওপরেও বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। তার পরেও আশঙ্কা রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যার। আল্লাহ মাফ করুক, এমনটি ঘটলে আমাদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে; তা জানেন একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন।

অঘোষিত এক দুর্ভিক্ষ পরিলক্ষিত হচ্ছে বিশ্বময়। অবশ্য ঠিক দুর্ভিক্ষ না হলেও বেকারত্বের সংখ্যা যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে মনে হচ্ছে, দুর্ভিক্ষ বেশী দূরে নয়। আল্লাহই একমাত্র রক্ষাকারী।

মজার বিষয় হচ্ছে, প্রাণঘাতি বা মহামারি এই ভাইরাসটি আমাদেরকে মানবিক করতে পারেনি। যেখানে লক্ষ লক্ষ লোক অনাকাঙ্ক্ষিত বেকারত্বের অভিশপ্ত দুর্বিষহ জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, সেখানে এ মহামারিকে ইস্যু করে এক শ্রেণির গুটিকতেক লোক আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে।

আসলে কথা এরা হচ্ছে, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা খাতে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ঔষধ আমদানিকারক, সরবরাহকারী ও বিক্রেতা মধ্যস্বত্বভোগী কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চক্র। অনেক চিকিৎসক মানবিক হলেও মানবিক হতে পারেনি ব্যক্তি মালিকানাধীন অধিকাংশ বড় ধরনের হাসপাতালের মালিকরা।

এরা এমপি হওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকা অকাতরে বিলিয়ে দিতে পারে, কিন্তু অসহায় মানুষদের চিকিৎসার জন্য ছাড় দিতে পারে না।বাড়তি বিল চাপিয়ে দেয়া তো এদের মজ্জাগত অভ্যাস।আল্লাহ এদেরকে হেদায়েত দান করুক।

দেশের এই ক্লান্তিকালে বা দুর্যোগময় সময়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো জনপদ। এরা সুযোগ পেলেই জিনিসের দাম বাড়ানোর প্রবণতা আমাদের বাড়ছে বৈ কমে নাই। তাদের নীতি নৈতিকতা একেবারেই শূণ্যের কোঠায়। আর কিছু কিছু নেতা বা জনপ্রতিনিধিরা সেবার পরিবর্তে লুটপাটে খাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।অবশ্য সরকার তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হয়।

করোনা (কোভিড-১৯) মোকাবেলায় আমাদের প্রয়োজন সচেতনতা। কিন্তু তার সিকিভাগও নেই আমাদের মধ্যে।অন্যদিকে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু না বলাই ভালো। ভয়াবহ রকম আতঙ্কের মধ্যেই আজকের (২৯জুন) হৃদয় বিদারক সংবাদ হচ্ছে, ঢাকায় লঞ্চডুবি। এতে মারা গেছেন ৪০ থেকে ৫০ জন। এ যেন মরার ওপর খাড়ার ঘা।

হে আল্লাহ!আপনি আমাদেরকে রক্ষা করুন। লঞ্চ ডুবিতে মৃতদেরকে জান্নাতবাসী করুন, ক্ষতিগ্রস্তদেরকে হেফাজত করুন। আ-মীন


লেখকঃ আবদুর রব ছিদ্দিকী
সাধারণ সম্পাদক
রায়পুর যুব কল্যাণ সমিতি, ঢাকা