জানতে হবে মেজর সিনহা হত্যার উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়

জানতে হবে মেজর সিনহা হত্যার উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়: আবু হেনা

প্রকাশিত: ৭:৪২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২০

এ সময়ের সব’চে বেশি আলোচনার বিষয় মেজর সিনহা মো: রাশেদ খান হত্যা এবং কক্সবাজারের টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ প্রদীপ কুমার দাস।

মেজর সিনহা একজন সাবেক সেনা অফিসার যিনি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসএসএফের সদস্য ছিলেন। মেধাবী এবং চৌকস অফিসার ছাড়া এ দায়িত্ব কারো বরাতে হয় না বলেই আমার জানা। শুধু তাই নয়—

এমন দায়িত্ব দেওয়ার পূর্বে বিবেচনায় নেয়া হয় তাঁর সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, ক্ষিপ্রতা ও পারিবারিক পরিচিতি ইত্যাদি। সে কারণেই এমনি একজন সিনহা হত্যাকাণ্ড আজ ‘টক অব দি কান্ট্রি’।

অন্যদিকে ২২ মাস দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে ইয়াবা কিংবা মাদক ইস্যুতে ১৪৪ টি ক্রসফায়ার দিয়ে এবং এর মাধ্যমে ২০৪ জনকে হত্যার করে, যার অর্ধেক ক্রসফায়ারই হয়েছে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে, আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন ওসি প্রদীপ কুমার দাস।

মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করার জন্য চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে ৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

মেজর সিনহাকে হত্যা করা হয় ৩১ জুলাই ২০২০ রাতে ঐ মেরিন ড্রাইভেই। পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকতের চালানো গুলিতেই হত্যা হয় মেজর সিনহা। একই সঙ্গে মেজর সিনহার সাথে থাকা সাহেদুল ইসলাম ওরফে সিফাত (২১) নামের এক ছাত্রকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এখানেই শেষ নয়। হত্যার অভিযোগ এনে উল্টো নিহত রাশেদ ও গ্রেফতার হওয়া সিফাতকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। এছাড়া রাশেদ ও সিফাতের হেফাজত থেকে ৫০ টি ইয়াবা ও চার পোটলা (২৫০ গ্রাম) গাঁজা উদ্ধারের অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনে আরেকটি মামলা করেছে পুলিশ।

এই ঘটনার পর ৫ আগষ্ট ২০২০ তারিখে সেনাবাহিনী প্রধান এবং পুলিশ প্রধানদ্বয় কক্সবাজারে এক যৌথ প্রেস ব্রিফিং-এ সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলতে চাই, অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনা দুই বাহিনীর সম্পর্কে সংকট সৃষ্টির মতো কিছু হবে না’। অন্য দিকে পুলিশ প্রধান বেনজির আহমেদ বলেন, ‘সেনা বাহিনীর সঙ্গে পুলিশের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আস্হার সম্পর্ক।

মেজর (অব:) সিনহার মৃত্যুতে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন ব্যত্যয় হবে না। কমিটি প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তদন্ত করবে। কমিটি যে সুপারিশ দেবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্হা নেয়া হবে’। দুই প্রধান এই ঘটনাকে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই ঘটনার দায় কোন বাহিনীর নয়।

মেজর সিনহার মৃত্যুর পর পুলিশের দায়ের করা হত্যা ও মাদকের মামলা নিয়ে দুই বাহিনীর প্রধানের পক্ষ থেকে কোন কিছু বলা হয়নি। প্রাথমিকভাবে মেজর সিনহা এবং সিফাতকে ইয়াবা সেবন কিংবা ব্যবসায় জড়ানো হয়েছে এবং হয়তোবা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে এটা একজন মাদকের সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য ব্যক্তির মতই একটি ক্রসফায়ারের ঘটনা।

পুলিশ প্রধান বলেছেন, দেশে আইনের শাসন রয়েছে। সুতরাং আইনের শাসনের দেশে ভবিষ্যতে এরকম হত্যাকাণ্ড কিংবা বিনা বিচারে কোন হত্যাকাণ্ড আর যেন না ঘটে তেমনি একটা বক্তব্য পাওয়া গেলে আমাদের মতো সাধারনদের পুলিশের প্রতি আস্হা ও বিশ্বাস আরও অনেকখানি বেড়ে যেতো। তবে একথা বলার সুযোগ কিন্তু পুলিশ প্রধানের জন্য শেষ হয়ে যায়নি।

দেশের সংবিধান বিনা বিচারে হত্যা সমর্থন করে না। দেশের সাধারন মানুষও তাই। ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা রজনীতিবিদরা হয়তো ভাবেন কোন কঠিন আইনই তাদের জন্য টেনশনের কোন বিষয় নয়। আর সে কারণেই হয়তো ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ভর করে ২০১৯ সালে ওসি প্রদীপ কুমার দাস অর্জন করেছিলেন পুলিশের সর্বোচ্চো পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ বা বিপিএম পেয়েছিলেন। যদিও ইতিমধ্যে ওসি প্রদীপ কুমার দাস এবং পরিদর্শক লিয়াকতসহ ৯ জন পুলিশ সদস্যকে আদালতের নির্দেশে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

যেহেতু সেনা প্রধান এবং পুলিশ প্রধান মেজর সিনহা হত্যাকে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেছেন সেহেতু এই ঘটনাকে আমি সেভাবেই বিবেচনা করলেও, আইনি ভাষায়, প্রত্যেক খুনের পিছনে উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় নামের দুটি বিষয় কাজ করে। এই উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় কি ছিল মেজর সিনহা হত্যার ক্ষেত্রে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা জরুরী বলে বিরাজমান আইন মনে করে।

দুই বাহিনীর কাছ থেকে বিচার বহির্ভুত হত্যা বন্ধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন বক্তব্য না পাওয়া গেলেও ৫ আগষ্ট’ ২০ তারিখে মহাখালিস্হ রাওয়া ক্লাবে অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারগণ বিচার বহির্ভুত হত্যা তথা ক্রসফায়ারে হত্যা বন্ধের দাবী উত্থাপন করেন। আমরা আম জনতাও তাদের এই দাবীকে সমর্থন করি। এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে আমলে নিবেন বলে আশা করছি।

পাশাপাশি উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় ছাড়া যেহেতু কোন হত্যা হয় না সেহেতু ওসি প্রদীপ কুমার দাসকে অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে বিগত ২২ মাসে যে ১৪৪টি ক্রসফায়ার ঘটিয়েছেন এবং যে ২০৪ জন লোক হত্যা করা হয়েছে সেক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় কি ছিল।

পরিশেষে বলতে চাই, যে সকল ইয়াবা বহনকারী, ব্যবসায়ী কিংবা সেবনকারীদের হত্যা করা হয়েছে তারা কি আইন প্রয়োগকারী সংস্হার কাছে আম গাছের আমের মত ছিল কিনা? যে বছর বছর আম খাবো, আর বনিবনায় সুবিধা না হলেই আমের ডালটা ছেঁটে দিবো, কিন্তু গাছটা রেখে দেবো।

তা নাহলে বছরের পর বছর ধরে গাছের ডালতুল্য ইয়াবার ব্যবসায়ী কিংবা সেবনকারি হত্যা হলেও গাছ রয়ে যাচ্ছে বহাল তবিয়তে, যেখান থেকে নিয়মিত গজায় ডাল এবং ইয়াবা কিংবা মাদক নিয়ন্ত্রনের নামে মাঝে মাঝে ছেঁটে দেয়া হয় ডাল পালা। ডাল পেলে গাছ পাওয়া যায় না কিংবা যাবে না এটা কেমন কথা?

হাজার হাজার করোনা নেগেটিভ সনদ দিয়ে যারা করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে অবাধে সমাজে ঘোরাফেরার মনোবল জোগানোর মাধ্যমে করোনা সংক্রমনের কাজ করে গোটা দেশকে করোনা বোমায় রূপান্তরিত করলো, তাদের তুলনায় ইয়াবা গাছের ডালপালার অপরাধ অনেক নগন্য নয় কি?

আইনি ধারা যেভাবে প্রয়োগ হতে যাচ্ছে তাতে ঐ সকল করোনা নেগেটিভ সনদ প্রদানকারীদের ৭-১০ বছেরের জেল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেটা তাদের অপরাধের তুলনায় কোন শাস্তিই নয়। অথচ এই সনদ প্রদানকারীদের যদি কোন বিষাক্ত সাপের সাথে তুলনা করা হয় তবে করোনা নেগেটিভ সংক্রান্তে ভুয়া সনদ প্রদানকারী শাহেদ- সাবরিনা ঐ সাপের লেজ মাত্র।

তাই সবশেষে আমি বলতে চাই, গাছের ডাল পাওয়া গেলে অবশ্যই গাছ পেতে হবে, আর উপড়ে ফেলতে হবে সেই গাছকে। আবার সাপের লেজ পাওয়া গেলে পেতে হবে মাথাকে। মোর ফেলতে হবে গোটা সাপকে। নয়তো অনন্তকাল ধরে বাজারে থাকবে ইয়াবা কিংবা মাদক। ক্রসফায়ারে ঝরবে প্রান। জন্ম হবে নতুন নতুন শাহেদ-সাবরিনা, দুর্ভোগ পোহাবে গোটা দেশ।


লেখক-কলামিস্ট: আবু হেনা রাজ্জাকী


 

ভুলুয়াবিডি/এএইচ

নিউজটি শেয়ার করুন।