টাইলস মিস্ত্রি থেকে মানবপাচারকারী

প্রকাশিত: ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ৪, ২০২০

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা: পেশায় টাইলস মিস্ত্রি। তবে ধীরে ধীরে মানবপাচার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন কুষ্টিয়ার হাজী কামাল হোসেন। লিবিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে নিয়মিত মানুষ পাঠাতেন কামাল।

নিজের কোনো বৈধ এজেন্সি না থাকলেও নানা মাধ্যমে তিনি লোক পাঠাতেন। তার নিজ এলাকা কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খোর্দ্দ আইলচারাসহ আশেপাশের গ্রামের অনেককেই তিনি বিদেশ পাঠিয়েছেন।

এলাকার মানুষের কাছে আস্থা ও জনপ্রিয়তা বাড়াতে এলাকায় মসজিদ মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত দান করেছেন। গরিব মানুষদের নিয়মিত অর্থ দান করতেন।

এক সময় বিএনপির রাজনীতি করলেও পরে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় রাজনীতি করতেন। এলাকায় একটি বাড়ি ও মাঠে কিছু জমি ছাড়া তার কোনো সম্পদ নেই। গ্রেপ্তারের পর তার নিজ এলাকায় এখন নানা আলোচনা চলছে।

পরিবারের লোকজন বলছেন, কামাল হোসেন চুনোপুটি। তার পিছনে বড় বড় রাঘব বোয়াল আছে। তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। তদন্ত করলেই প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে।

লিবিয়ায় মানুষ পাচার ও ২৬ বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের পর র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারকৃত হাজী কামাল হোসেনের এলাকায় গিয়ে নানা তথ্য মিলেছে।

কামাল হোসেনের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আইলচারা ইউনিয়নের খোর্দ্দ আইলচারায় গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছাড়াও তার পরিবারের সদস্যদের সাথে নানা বিষয়ে কথা হয়।

এসময় কামালের বাড়িতে ভিড় জমে যায়। গ্রেপ্তারের খবর শুনেও তার বাড়িতে অনেকেই এসেছেন।

কামাল হোসেনের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক লুৎফর রহমান বলেন, ডিগ্রি ফেল করার পর বাবা রাগ করলে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় কামাল। বেশ কয়েক বছর বাইরে কাটিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

এরপর পাড়ি জমায় সৌদি আরব। আড়াই বছর সেখানে টাইলস মিস্ত্রির কাজ শেষে দেশে ফিরে আসে। এরপর রাজধানী ঢাকায় টাইলস মিস্ত্রির ঠিকাদারি কাজ শুরু করে, নিজেও কাজ করত। এভাবেই এক সময় জড়িয়ে পড়েন আদমপাচারের ব্যবসায়।

‘তার নিজের কোনো এজেন্সি ছিল না। অন্যের সঙ্গে তিনি ব্যবসা করত। লিবিয়ায় যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি নিয়মিত লোক পাঠাত। একবারে ২০০ লিবিয়ার ভিসা সংগ্রহ করার পর যুদ্ধ শুরু হলে লোক পাঠানো বন্ধ হয়।

কামাল হোসেন বড় ধরনের লোকসানে পড়ে। অনেক অর্থ তার লোকসান হয়ে যায়। এরপরও মাঝে মধ্যে তিনি লোক পাঠাত। সে-তো চুনোপুঁটি। বড় বড় রাঘব বোয়ালরা আছে। ১০ লাখ টাকা কামাল আয় করলে আট লাখই তার বিভিন্ন জায়গায় খরচ হয়েছে।

কামাল হোসেনের বোনেদের দাবি, তার ভাইয়ের বিভিন্ন ব্যাংকে অ‌্যাকাউন্ট থাকলেও অর্থ নেই। তার যদি ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা থাকত, তাহলে তিনি বাসায় থাকতেন না। গ্রামের বাড়িতে একটি একতলা ভবন আছে আর মাঠে কিছু জমি ছাড়া এলাকায় তার কোনো সম্পদ নেই। ২০০ কোটি টাকার যে কথা বলা হচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই।

লুৎফর রহমান বলেন, ‘লিবিয়ায় যে ২৬ জন লোক মারা গেছে ও ১১ জন আহত হয়েছে, তার মধ্যে একজন আমার ভাইয়ের লোক ছিল। বাকিরা অন্য লোকের মাধ্যমে গিয়ে ছিল। লিবিয়ায় যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে সেটা দুঃখজনক ও অমানবিক। এ ঘটনার নিন্দা আমরাও জানাচ্ছি। তবে এর পিছনে বড় বড় গডফাদার রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছানোর দায়িত্ব ছিল আমর ভাইয়ের। তাও চোরাই বিভিন্ন পথে লোক যেত। পরে লিবিয়া থেকে বর্ডার পার হয়ে ইতালি যেত অনেকে। আর ইতালি হয়ে ফ্রান্সে গিয়েছে এমন লোকও আছে আমাদের গ্রামেই। তারাতো ভাল আছে।

আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে কেউ কোনদিন কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেনি। এখন অনেকে অনেক কথা বলছে, এটার কোনো ভিত্তি নেই।

স্থানীয় এলাকাবাসী জানিয়েছেন, ২০০২ সালে একবার এলাকায় নির্বাচন করবেন বলে পোস্টার মারেন কামাল হোসেন ওরফে হাজী কামাল। সেই পোস্টারে তারেক জিয়া সহ বিএনপির নেতাদের ছবি ছিল। ২০০৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও পরে তিনি আর নির্বাচন করেননি।

তার প্রতিবেশিরা জানান, কামাল হোসেনরা চার ভাই তিন বোন। বাবা জামাত আলী লেখাপড়া না জানলেও সব ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত করনে। সবাই চাকরি করে। তার মামা আইলচারা ইউনিয়নের একটানা ১৫ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। এ কারণে এলাকায় তাদের প্রভাব রয়েছে। বাবা মারা গেলেও কামাল হোসেনের মা এখনও জীবিত আছেন।

কামাল হোসেনের মা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। তিনি বলেন, আমার ছেলে নির্দোষ।

 

ভুলুয়া বাংলাদেশ/এএইচ