ড. বিজন কুমারের যত জালিয়াতি

প্রকাশিত: ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০

দেশজুড়ে এখন সবার মুখে মুখে ঘুরছে ড. বিজন কুমার শীলের নাম। করোনা পরীক্ষার টে’স্ট কি’ট আবিষ্কারের দাবি করায় অনেকেই তাকে নায়কের আসনে বসিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু ড. বিজন আসলেই কি তাই?

নাকি নায়কের মু’খোশ পরে থাকা এক ধোঁকা’বাজ তিনি? এর উত্তর পেতে তার অতীতটা একটু দেখে নেওয়া যাক।

ড. বিজন কুমার শীল বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (BLRI) (সাভার, ঢাকা) ১৯৮৮-২০০২ পর্যন্ত প্রাণী স্বাস্থ্য বিভাগে সা’য়েন্টিফিক অফি’সার-প্রি’ন্সিপাল সায়ে’ন্টিফিক অফিসার বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন।

তিনি ১৯৯১এ লন্ডন থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে ফিরে আসার পর থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সময়ে তিন ধরনের গবেষণা জালি’য়াতি করেন।

জালিয়াতি-১

১৯৯২/৯৩ সালে তিনি কোন প্রকার ল্যাবরেটরি গবেষণা না করেই ও প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণ অগোচরে “The Bangladesh Times” এবং অন্য দুইটি বাংলা পত্রিকায় প্রচার করেন যে তিনি “Japanese Encephalitis Virus strain-AR” নামে একটি নতুন avirulent virus strain আবিষ্কার করেছেন যা দিয়ে সরাসরি Japanese Encephalitis Virus এর Vaccine তৈরি করা যাবে।

অথচ কেউ কখনো তাকে গবেষণাগারে এ নিয়ে কোন কাজ করতে দেখেনি এবং Virology গবেষণা করার মত কোন ল্যাব সুবিধাও তখন ছিল না। তার এই আচমকা খবর শুনে প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক, বিভাগীয় প্রধান ও সহকর্মী বিজ্ঞানীরা হতবাক। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে ড. শীল এর উক্ত গবেষণা বিষয়টি সম্পূর্ণ জালিয়াতি বলে প্রমাণিত হয়। তারপর ড. শীল উক্ত বিষয়টি চিরদিনের জন্য চেপে যান।

জালিয়াতি-২

১৯৯৪ সালে নতুন মহাপরিচালক (ইন চার্জ) যোগ দেন এবং ড. শীল তার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন ও ইতিমধ্যে বিভাগীয় প্রধান ও পরলোক গমন করেন। তিনি ছাগলের পিপিআর রোগ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং কয়েক মাস পরেই তিনি ঘোষণা দেন যে পিপিআর ভ্যাকসিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ভাইরাস strain আবিষ্কার করে ফেলেছেন এবং দুই এক বছরের মধ্যেই তিনি জাতিকে ছাগলের পিপিআর ভ্যাকসিন উপহার দিতে পারবেন।

প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক তাকে ব্যাপক উৎসাহ এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখেন। উক্ত গবেষণার জন্য তিনি সরকারি, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা থেকে কোটি কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা পান।

তারপর ১৯৯৬ সালে সরকার পরিবর্তন হয়, নতুন মন্ত্রী এবং নতুন মহাপরিচালক আসেন, কিন্তু ড. শীল-এর গবেষণা এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দ অব্যাহত থাকে।

ইতোমধ্যে উক্ত বিভাগ থেকে ৬ জন বিজ্ঞানী পিএইচডি অর্জনের জন্য বিদেশ গমন করেন এবং আরও ৬-৭ জন বিজ্ঞানী সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিএলএস চলে যান এবং ড. শীল গবেষণার নামে একক রাজত্ব ও আয়েশি জীবন যাপন চালিয়ে যান ২০০২ সাল পর্যন্ত, কিন্তু পিপিআর ভ্যাকসিন-এর দেখা আজও মেলেনি।

উক্ত গবেষণার ফলাফল কি তা আজও জাতি জানতে পারেনি, নেই কোন গবেষণা প্রকাশনাও। সবই ছিল যেন শুভঙ্করের ফাঁকি, জালিয়াতি এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মস্বাদের কৌশল।

প্রসঙ্গত, ড. শীল সিংহ ভাগ সময় খরচ করতেন রাজনৈতিক নেতা মন্ত্রীদের এবং পত্রিকার সাংবাদিকদের পেছনে ঘোরাঘুরি করে এবং প্রকল্পের কেনাকাটাতে।

তৎকালীন বিশাল বিএনপি আমলে। জনাব গয়েশ্বর রায়ের সঙ্গে ও পরবর্তীতে আ.লীগ মৎস্য ও প্রানীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জনাব সতিশ রায়ের সঙ্গে ছিল তার দহরম মহরম সম্পর্ক, তাই প্রতিষ্ঠানে ছিল তার একচ্ছতত্র আধিপত্য।

জালিয়াতি-৩

২০০১ সালে দেশে পোলট্রি ফীডে ফাঙ্গাল আফ্লাটক্সিন পাওয়া যায়। ড. শীল তখন প্রথম আলো পত্রিকার সাথে সাক্ষাৎকারে বলেন যে উক্ত ফীড খাওয়া মুরগির ডিম ও মাংসের মাধ্যমে আফ্লাটক্সিন মানুষের দেহে ক্যান্সার রোগ তৈরি করবে। যা প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ ভুল ও অবৈজ্ঞানিক তথ্য। অনেক ডাক্তার তাঁর এই মিথ্যা বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

তার এই সংবাদ প্রকাশের পর দেশের পোলট্রি শিল্পে ব্যাপক ধস নামে এবং এর প্রতিবাদে পোলট্রি শিল্পের হাজারো লোক BLRI ঘেরাও করে, ভাংচুর করে এবং ড. শীল-এর অপসারণ চায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মহাপরিচালক সাহেব মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে ড. শীল কে চাকুরী থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেন।

চলতে থাকে ড. শীল-এর বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত এবং বেরুতে থাকে তার একের পর এক চাঞ্চল্যকর গবেষণা জালিয়াতির তথ্য। অতঃপর অবস্থা বেগতিক দেখে ২০০২ সালের কোন এক সময় গোপনে ড. শীল সপরিবারে পাড়ি জমান সিঙ্গাপুরে, গ্রহণ করেন সেখানকার নাগরিকত্ব।

দীর্ঘ আঠার বছর পর এই করো’নাভাইরাস সঙ্কটের সময় সুযোগ সন্ধানী বিজ্ঞানী, ড. শীল নতুন ফন্দি নিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পিঠে ভর করে এবং কোভিড-১৯ পরীক্ষার কিট আবিষ্কারের বড় ধরনের টোপ দিয়ে পুরো জাতির উপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেন।

বিগত ১৮ বছর ড. শীল নামের কোন বিজ্ঞানীর অস্তিত্ব বিজ্ঞানের জগতে একেবারেই দেখা বা শোনা যায়নি। একজন সফল বিজ্ঞানীর আসল এবং একমাত্র পরিচয় তার গবেষণালব্ধ ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য জার্নালে প্রকাশনার মাধ্যমে।

কিন্তু তার নিজস্ব গবেষণার কোন প্রমাণ কোথাও মেলে নি (২/৩ টি ছোট খাট গবেষণার অতি ক্ষুদ্র অংশীদার ছাড়া, যা অতি নগণ্য জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে ২০১১ পর্যন্ত)।

২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি গবেষণা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। জানা যায়, ড. শীল ফেব্রুয়ারির ২০২০ কোন এক সময় তার এই পরকল্পনা নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে গণস্বাস্থ্যে আসেন এবং রাতারাতি তাকে প্রফেসর, চীফ বিজ্ঞানী ইত্যাদি পদবি দিয়ে প্রচার চালান হয়।

বাংলাদেশের কিছু মিডিয়া/পত্রিকা ডঃ শীল সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসত্য ও অতিরঞ্জিত তথ্য উপস্থাপন করে তাকে একজন মহা বিজ্ঞানী বানিয়ে ফেলেছেন। বলা হচ্ছে তিনি ছাগলের পিপিআর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার অপরাধে ঔষধ শিল্পের মালিকদের রোষানলে পড়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

অথচ একজন অসৎ বিজ্ঞানী হিসেবে গবেষণা জালিয়াতির অপরাধে চাকুরী থেকে তিনি বরখাস্ত হন এবং তদন্তকালীন সময়ে চূড়ান্ত শাস্তি নিশ্চিত জেনে সবার অগোচরে পাড়ি জমান সিঙ্গাপুরে।

তাঁর সম্পর্কে বার বার বলা হয়েছে যে তিনি ২০০৩ সালে সিঙ্গাপুরে সার্স ভাইরাস নির্ণয়ের Dot Blot kit আবিষ্কার করেন, যা চীন তার কাছ থেকে কিনে নেয় যা খুব হাস্যকর এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা অপপ্রচার।

ড. শীল কখনো একজন বিজ্ঞানী হিসেবে সিঙ্গাপুরের কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বা Singapore National University তে চাকুরী করেননি, তাই SARS Dot Blot kit আবিষ্কারের প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া গবেষণা কীট প্রথমে সে দেশের সরকারি ও পরে FDA/WHO অনুমোদন নিতে হয়। একজন ব্যক্তি এককভাবে কখনো একটি আবিষ্কারের ফলাফল চীনের কাছে বিক্রি করতে পারে না।

যে ব্যক্তি কোন গবেষণা না করেই মিথ্যা আবিষ্কারের খবর পত্র পত্রিকায় প্রচার চালায়, আর সে ব্যক্তি ২০০৩ সালে SARS Dot Blot kit আবিষ্কার ও তা চীনের কাছে বিক্রির মত খবরটি গত ১৭ বছরেও কোন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করেনি, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর কেউ জানল না?

আর প্যাটেন্ট কোন উদ্ভাবনের চূড়ান্ত ফলাফল নয়, কোন নতুন ধারণা তত্ত্বও প্যাটেন্ট করা যায়। আরও একটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, ড. শীল ২০০২ থেকে অদ্যাবধি সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে সেখানে পরিবারসহ স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং তিনি ২০০৩ সালে SARS Dot Blot kit আবিষ্কার করার প্রচারণা চালাচ্ছেন।

অথচ সিঙ্গাপুরের করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়েও ভয়াবহ হওয়া স্বত্বেও GR Dot Blot COVID-19 কিটটি কেন সিঙ্গাপুরেও ব্যাবহার করছেন না? এটা কি দেশ প্রেম, নাকি বিজ্ঞানে দুর্বল কিন্তু রাজনীতিতে সবল সহজ-সরল বাঙালির দেশে বিজ্ঞান নিয়ে রাজনীতি খেলা ও সহজ উপায়ে মহাবিজ্ঞানি বনে যাওয়ার কৌশল?

সূএ: সম্পাদক ডটকম