ধোঁয়াশায় পিইসি-জেএসসি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার চিন্তা

ধোঁয়াশায় পিইসি-জেএসসি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার চিন্তা

প্রকাশিত: ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০২০

করোনাভাইরাসের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে।

এরই মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে, একাদশের ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে তিন মাস দেরিতে। সময়মতো পিইসি-জেএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে কি না তা নিয়েও কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি দুই মন্ত্রণালয় থেকে।

করোনা পরিস্থিতির পর শিক্ষা কার্যক্রমকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে তা নিয়েও বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দফায় দফায় বৈঠক করে নানা রকম পরিকল্পনা ও আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ মন্ত্রণালয় দুটির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তবে শিক্ষা কবে স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত নন তারা।

জানা গেছে, কোভিড-পরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রমের নীতি কৌশল চূড়ান্ত করার কাজে ব্যস্ত শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত বুধবার (১২ আগস্ট) জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যসূচি পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরু করেছে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ আছে। কবে নাগাদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করা যাবে, তা নিশ্চিত নয়। এ কারণে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। যদিও তা এখনো চূড়ান্ত নয়।

ময়মনসিংহের প্রাথমিক শিক্ষা অ্যাকাডেমিতে (নেপ) প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর পৃথক আরেকটি কমিটির কাজ চলছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলেছে, কভিড-১৯ মহামারীকে বিবেচনায় নিয়ে জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের বিভিন্ন বিকল্প নিয়েই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভাবছে।

গত বুধবার পিইসিসহ প্রাথমিক স্তরের বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে খুলতে পারলে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা নেওয়ার চিন্তাভাবনা আছে।

আমরা সেপ্টেম্বরের দিকে যদি স্কুল খুলে দিতে পারতাম, তাহলেও এটা সম্ভব হবে। আবার যদি তা না হয় (সেপ্টেম্বরে না খোলে), অক্টোবরের দিকে খোলে, তাহলে ৫০ নম্বরের পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি। এগুলো আমাদের চিন্তাভাবনা। কিন্তু যদি আরও পরে খোলা হয় তাহলেও বিকল্প ভাবতে হবে।

অন্যদিকে মহামারীর কারণে এ বছর পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির সমাপনী বা পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে বলে গত সোমবার (১০ আগস্ট) গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আকরাম আল হোসেন।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আমরা ন্যূনতম ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাই না। পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হবে তখনই তারা স্কুলে যাবে। যেহেতু কবে প্রতিষ্ঠান খোলা যাবে তা আমরা জানি না। তাই একাধিক বিকল্প হাতে রেখে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে।

এদিকে গত এপ্রিল থেকে স্থগিত থাকা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নিয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না মন্ত্রণালয়। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে আন্তঃশিক্ষাবোর্ড কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির আর অবনতি না ঘটলে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বা অক্টোবরের শুরুতে এই পরীক্ষা শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে।

বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরীক্ষার কেন্দ্রে ‘জেড’ আকৃতিতে শিক্ষার্থীদের বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে একটি কক্ষে প্রথম বেঞ্চে দুজন শিক্ষার্থী বসলে দ্বিতীয় বেঞ্চে বসবে একজন। এর পরের বেঞ্চে আবার বসবে দুজন। এভাবে একজন শিক্ষার্থী থেকে আরেকজন শিক্ষার্থীর তিন ফুট দূরত্ব নিশ্চিত করা হবে।

প্রয়োজনে বেঞ্চগুলো আগের চেয়ে দূরে দূরে বসানো হবে। এভাবে শিক্ষার্থীদের বসালে কতগুলো কেন্দ্রের প্রয়োজন হতে পারে, সে বিষয়ে মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) স্থানীয় শিক্ষকদের নিয়ে এ ব্যাপারে কাজ করছেন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, আমরা বিকল্প পদ্ধতিতে কীভাবে পরীক্ষা নেওয়া যায় সেই পরিকল্পনা করছি। তিন ফুট দূরত্ব নির্ধারণ করে শিক্ষার্থীদের বসালে কতগুলো কেন্দ্র বা উপকেন্দ্রের প্রয়োজন হতে পারে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। এগুলো পাওয়ার পর শিগগিরই এ সংক্রান্ত প্রস্তাব আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করবে।

এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে নাগাদ খোলা যেতে পারে এ নিয়েও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন বলেন, করোনায় শিক্ষায় ক্ষতি পূরণে বিশেষ করে সামনে কোন মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে সে সংক্রান্ত একটা খসড়া প্রস্তাব আমরা পেয়েছি। মতামতকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এ নিয়ে এনসিটিবি কাজ করবে।

করোনা সংক্রমণের শীর্ষস্থানীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্সের প্রকাশিত প্রতিবেদনে মহামারীর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বলে প্রমাণ করা হয়েছে। গত জুলাইয়ে দুই সপ্তাহের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ভয়ঙ্কর পরিণতি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে সংগঠনটি।

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে স্কুল খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি দুই সপ্তাহের মধ্যেই করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৯৭ হাজার শিশু। স্কুলে যাতায়াতের পথেই যে সংক্রমণ, প্রতিবেদনে তা নিশ্চিত করে বলা হয়েছে।

ওই দুই সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কমপক্ষে ২৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহে যদি প্রায় এক লাখ শিশু কভিডে সংক্রমিত হতে পারে, তা হলে স্কুল চালু রাখলে সংখ্যাটা গিয়ে কোথায় পৌঁছবে তা নিয়ে শঙ্কিত সংগঠনটি।

জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৩৬ হাজার ৮৪৩ শিক্ষার্থী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৫ হাজার ৮২৫, প্রাথমিকে ৮৭ লাখ ৯৯ হাজার ৩৩, মাধ্যমিকে ৮৩ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৬ ও উচ্চশিক্ষায় ১২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন।

 

ভুলুয়াবিডি/এএইচ

নিউজটি শেয়ার করুন।