পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আফিম উৎপাদনক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ তালেবানদের

প্রকাশিত: ৩:১১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২১
আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে তালেবানদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পপিক্ষেত: ফাইল ছবি

বৈশ্বিক আফিম ও হেরোইন সরবরাহের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে আফগানিস্তান থেকে। বিপুল অংকের এই মাদক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ প্রধানত তালেবানদের হাতে। গত দুই দশকে তালেবানদের আয়ের এ উৎসে বারবার আঘাত হানার চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যদিও সামান্যতম সফলতাও আসেনি। এখনো গোটা বিশ্বে আফিমজাত মাদকের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী তালেবানরাই। আফগানিস্তানে তাদের ক্ষমতা দখলের ধারাবাহিকতায় পৃথিবীজুড়েই মাদক সমস্যা আরো মারাত্মক আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

যুক্তরাষ্ট্রের আফগান বিপর্যয় ও তালেবানদের বিদ্যৎগতির সাফল্যের অন্যতম বড় অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে মাদক বাণিজ্যকে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেড় দশকে ওয়াশিংটন ৮৫০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে শুধু তালেবানদের আফিম ও হেরোইন বাণিজ্য বন্ধের জন্য।

এজন্য পপিক্ষেত ধ্বংস থেকে শুরু করে বিমান হামলা, সন্দেহভাজন ল্যাবে অভিযান চালানোসহ সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে মার্কিন সৈন্যরা। তার পরও এ মাদকের সরবরাহ চেইনে সামান্যতম ভাঙন ধরানো সম্ভব হয়নি। বরং দিন দিন তা আরো সম্প্রসারিত হয়েছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যেই আফগানিস্তানের আফিম বাণিজ্যের পরিমাণ দেশটির মোট জিডিপির ৬ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে দাঁড়ায়। ওই বছরেই আফগান মাদক বাণিজ্য আকার দেশটির পণ্য ও সেবার বৈধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেও ছাড়িয়ে যায়।

একই দপ্তরের সাম্প্রতিক আরেক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৯ সালেও আফগানিস্তানে পপি (আফিম) চাষ হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছর দেশটিতে আফিম আবাদি এলাকা পরিমাণ নাটকীয়তায় বেড়ে যায়। ২০২০ সালে আফগানিস্তানে আফিম চাষ হয়েছে মোট ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে।

আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দেশটি থেকে অবধারিতভাবেই বিশ্বব্যাপী আফিম ও হেরোইনের সরবরাহ বাড়তে যাচ্ছে।

কাবুলের পতনের পর গোটা আফগান অর্থনীতিতে চরম মাত্রায় ধস নেমেছে। আসন্ন দিনগুলোয় দেশটিতে মারাত্মক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা। গৃহযুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে দেশটিতে বাস্তুচ্যুত হয়েছে অসংখ্য মানুষ। অদূরভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরো বাড়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে পড়া এ আফগান নাগরিকদের দুরবস্থার সুযোগ নিতে পারে তালেবানরা। তাদের নিয়োজিত করা হতে পারে মাদক উৎপাদন ও বাণিজ্যের সঙ্গে।

এছাড়া আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে বৈদেশিক অনুদাননির্ভরতা অনেক বেশি। তালেবানদের কাবুল দখলের ধারাবাহিকতায় এ অনুদানের বড় একটি অংশ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তালেবানরা আয়ের জন্য নিশ্চিতভাবেই মাদক বাণিজ্যের ওপর আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মানিকন্ট্রোলে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সাংবাদিক প্রবীণ স্বামী জানাচ্ছেন, মাদক ব্যবসা এখন আফগান অর্থনীতির প্রকৃত মেরুদণ্ড হয়ে উঠছে। ২০০৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তালেবানদের মোট আয়ের অর্ধেকই এসেছে মাদক ব্যবসা থেকে।

এজন্য নারকোটিক ফসল উৎপাদন ও চাষাবাদ, এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মধ্য এশিয়ার ভেতর দিয়ে অপরাধীনির্ভর সরবরাহ রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়েছে তাদের। এখন তাদের হাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা। স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণের এ প্রকৃত সুযোগকে কাজে লাগাবে তারা।

তালেবানরা ছাড়াও আফগানিস্তানে এখন সশস্ত্র আরো অনেক পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা ছাড়াও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকেন্দ্রিক মিলিশিয়া নেতা ও দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারাও উপরি উপার্জনের খোঁজে মাদক পাচার কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে দেশটিতে মাদক বাণিজ্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়ার জোর সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।

আফগানিস্তানে নিয়োজিত মার্কিন স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকনস্ট্রাকশনের (সিগার) তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তালেবানদের মাদক বাণিজ্য ধ্বংসে ৮৬০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে ওয়াশিংটন।

এজন্য একের পর এক পপিক্ষেত ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। মাদক উৎপাদনকারী ল্যাবে সশস্ত্র অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রপক্ষের সৈন্যরা। যুদ্ধবিমান থেকে বোমাবর্ষণও করা হয়েছে। পাশাপাশি আফিম চাষীদের বিকল্প কর্মসংস্থান বা ফসল চাষেও উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটভুক্ত সৈন্যরা।

মাদক বাণিজ্য বন্ধে নেয়া এসব পদক্ষেপ যে আদতেই খুব একটা সফল হয়নি, মার্কিন কর্তাব্যক্তিরাও তা স্বীকার করছেন। ২০১৬-১৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জোসেফ ভোটেলও সম্প্রতি একই কথা বলেন।বার্তা সংস্থা রয়টার্স’র সঙ্গে এক আলোচনায় এমন বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিনদের এসব উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হয়েছে। আফিম চাষের ওপর নির্ভরশীল আফগান কৃষকদের কাছ থেকে ক্রমেই দূরে সরে গিয়েছে কাবুলের সরকার ও তাদের বিদেশী পৃষ্ঠপোষকরা। এ আফিমচাষী কৃষকরা শেষ পর্যন্ত তালেবানদেরই অনুগত হয়ে উঠেছেন।

অতীতে তালেবানরা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও আফগানিস্তানের আফিম চাষ বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল। অব্যাহত আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তত্কালীন তালেবান সরকার আফিম চাষ বন্ধের ঘোষণা দেয়। পুরোপুরি বন্ধ না করলেও ওই সময় পপি চাষ কমিয়ে আনে তালেবানরা।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় আফিমচাষীদের বড় একটি অংশ তালেবানদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরে আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যদের তালেবানবিরোধী অভিযান শুরু হলে সে সময় তারা তালেবানদের পক্ষ ত্যাগ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ও ন্যাটো সৈন্যদের মাদক বিরোধী অভিযান তাদের তালেবান শিবিরে ফিরিয়ে নেয়। আফগানিস্তানে ক্ষমতার সাম্প্রতিক নাটকীয় পালাবদলের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছে।

অতীত এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে তালেবানদের মাদক বাণিজ্য থেকে সরে আসার কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন না পর্যবেক্ষকরা। বরং হাতে থাকা রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা কাজে লাগিয়ে তারা মাদকের বাজার সম্প্রসারণেই বেশি মনোযোগী হবে বলে আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলের। সূএ: বণিকবার্তা

 

 

 

ভুলুয়াবিডি/এএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন।