প্রতারণা-ছল-চাতুরিই ছিল মোহাম্মদ শাহেদের মূলধন

প্রতারণা-ছল-চাতুরিই ছিল মোহাম্মদ শাহেদের মূলধন

প্রকাশিত: ২:৫৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২০

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে চিকিৎসার নামে প্রতারণা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ শাহেদের (ওরফে শাহেদ করিম ওরফে মোহাম্মাদ শহীদ) অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি দীর্ঘ হচ্ছে।

পেশাদার এই ভয়ঙ্কর প্রতারক শাহেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে পুলিশ সদর দফতরকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো বঙ্গভবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব অনুষ্ঠানে ছিল শাহেদের সরব উপস্থিতি। টেলিভিশনের টকশো’তে উপস্থিত থেকে তিনি জাতিকে শোনাতেন নীতিকথা।

মুলতঃ শাহেদ একজন পেশাদার প্রতারক। প্রতারণা আর ছল-চাতুরিই ছিল শাহেদের মূলধন। প্রতারণা-চাপাবাজি করেই তার উত্থান। একসময় মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা করে গ্রাহকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। প্রতারণা মামলায় জেলও খাটেন। রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা প্রচারণা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তত দুই ডজন মামলা।

লম্পট ও প্রতারকরা সব সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায়। হঠাৎ বুদ্ধিজীবী প্রতারক শাহেদও টিভিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। শুধু করোনা নয়, বিশ্বের হেন কোনো বিষয় নেই যে তিনি জানেন না। প্রতিটি বিষয়ে বিজ্ঞের মতো জ্ঞানদান করতেন; সরকারকে তোষামোদ করতেন।

পলাতক এই ‘হঠাৎ বুদ্ধিজীবী’ শাহেদ করিমের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়। তার বাবার নাম মো. করিম। সেখানে তার বাবার ‘করিম সুপার মার্কেট’ নামের একটি বিপণিবিতান ছিল। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় শাহেদ সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় চলে আসে। এরপর মাঝে মাঝে সাতক্ষীরায় যেত। তার মা সাফিয়া করিম স্থানীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। শাহেদের এই উত্থানে এলাকাবাসী হতবাক।

শাহেদ নিজেকে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপকমিটির সাধারণ সম্পাদক শাম্মী আহমেদ বলেছেন, শাহেদ করিম কমিটির সদস্য নন। তিনি মাঝে মাঝে বৈঠকে আসতেন।

আগে কোনো একসময় হয়তো সদস্য ছিলেন। টক-শোতে উপস্থাপক প্রিয় হওয়ায় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সুবিধা আদায় এবং অপকর্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে ‘নতুন কাগজ’ নামে একটি নামসর্বস্ব পত্রিকা প্রকাশ করেন। নিজেকে সেই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে পরিচয় দিতেন। সাতক্ষীরায় তাকে সবাই প্রতারক শাহেদ হিসেবেই চেনে।

সূত্র জানায়, শাহেদ ঝানু প্রতারক। মানুষের চোখে ধুলা দেয়া বা মানুষকে আপন করে নেয়ার কৌঁশলে ছিল সে পটু। দামি গাড়ি ব্যবহার করে নিজেকে ওপর তলার মানুষ হিসেবে জাহির করতেন।

শাহেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের পরিচয় দিয়েছেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সদস্য; ন্যাশনাল প্যারা অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট; রিজেন্ট ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, রিজেন্ট কেসিএস লিমিটেড, কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটি, রিজেন্ট হসপিটাল লিমিটেড, রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান।

বিভিন্ন সরকারি দফতরে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তিনি নিজেকে কখনও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, উত্তরা মিডিয়া ক্লাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, কখনও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত এমন নানা পরিচয় দিয়ে কাজ বাগিয়ে নিতেন। কর্মকর্তা ও নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলতেন। মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে ছবি তুলতেন।

কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তুলতেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্পন্সর সহযোগিতা করে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতেন। এসব কিছু কাজে লাগাতেন নিজের স্বার্থে। অফিস, হাসপাতাল বা বাসা সবখানেই সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তোলা ছবি বাঁধাই করে টাঙিয়ে রাখতেন।

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা ছবিকে পুঁজি করেই শাহেদ বিভিন্ন অপকর্ম করছেন। তিনি একে একে করিম রিজেন্ট হসপিটাল লিমিটেড (মিরপুর), রিজেন্ট হসপিটাল লিমিটেড (উত্তরা), ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজ, রিজেন্ট ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, হোটেল মিলিনা গড়ে তোলেন।

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহেদের অপকর্ম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চলছে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা-বিতর্ক। প্রতারণা করাই যার মূল কাজ, সেই ব্যক্তি কীভাবে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে চলাফেরা করতেন; ছবি তুলে বাঁধিয়ে রাখেন, কিভাবে লাইসেন্স না থাকার পরও করোনা চিকিৎসার জন্য কাজ পেলেন? কীভাবে কথিত বুদ্ধিজীবী সেজে টক-শো’তে অংশগ্রহণ করতেন, তার প্রমোটার কারা এসব নিয়ে চলছে আলোচনা। অনেকেই বলছেন, শাহেদের পিছনে রাঘব- বোয়ালরা রয়েছেন।

করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা ও আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ঘিরে রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারণার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. শাহেদকে খুঁজছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। র‌্যাবের অভিযানের খবর পেয়ে তিনি পালিয়ে গেছেন।

হঠাৎ বুদ্ধিজীবী শাহেদকে নিয়ে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে যে তিনি কখনো মো. শাহেদ, কখনো শাহেদ করিম কখনো মেজর, কখনো সচিব, আবার ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করতেন। মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ থেকে ৬ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার নথিতে নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে আদালতে দুটি মামলা চলছে।

টিভির টক-শো’র বুদ্ধিজীবী শাহেদের প্রতারণার অভিযোগে ২০০৯ সালে পুলিশ ও র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে। ওই মামলার কাগজপত্রে দেখা যায়, খুলনার একটি টেক্সটাইল মিলের জন্য ২৫টি এসি সরবরাহের কার্যাদেশ পায় শাহেদ করিমের প্রতিষ্ঠান।

জিনিসপত্র নিয়ে ১৯ লাখ টাকার চেক দেন রাইজিং শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি এবং রাইজিং রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহেদ করিম। ব্যাংকে চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়। এ ঘটনায় মামলা করে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে শাহেদ প্রতারণা মামলায় গ্রেফতার হয়। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে দ্রুতই সে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে আসে।

এদিকে ২০১১ সালে শাহেদ ধানমন্ডিতে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বহুধাপ বিপণন (এমএলএম) ব্যবসা শুরু করেন। পরে টাকা নিয়ে চম্পট দেন। ওই সময় প্রতারণার শিকার লোকজন তাকে খুঁজতে শুরু করলে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। কয়েক বছর তিনি সপরিবারে ভারতের বারাসাতে ছিলেন। পরে মামলাগুলোয় জামিন পেলে দেশে ফিরে এসে প্রতারণা ব্যবসা শুরু করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহেদ ওরফে শহীদের প্রতারণার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে পুলিশ সদর দফতরকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। তবে রহস্যজনক কারণে ওই ব্যাপারে কোনো তৎপরতা দেখায়নি পুলিশ।

উপসচিব মোহা. নায়েব আলী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে (স্মারক নম্বর ৪৪.০০.০০০০.৭৫.০৮.০০৪.১৪.৭১৭) উল্লেখ করা হয়, মোহাম্মদ শহীদ বিভিন্ন সময়ে নিজকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর/লে. কর্নেল এবং ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ও সেনাবাহিনীর ১৪তম বিএমএ লং কোর্স এর অফিসার হিসেবে পরিচয় প্রদান করে বিভিন্ন অপকর্ম করে আসছেন।

তিনি বিগত ১৯৯৬-২০০০ সময়ে তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এডিসি ছিলেন মর্মেও পরিচয় প্রদান করে থাকেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন ভয়ঙ্কর প্রকৃতির লোক। তিনি নানা ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত। অভিযুক্ত ব্যক্তির নামে প্রতারণার দায়ে ইতোমধ্যে ৪২০ ধারায় ঢাকার বিভিন্ন থানায় ৩১টি এবং বরিশালে ১টি- মোট ৩২টি মামলা রয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে হওয়া ৩২টি মামলায় তিনি দুই বছর জেল খাটেন মর্মে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তসূত্র বলছেন, বিএনপির সময় তৎকালীন হাওয়া ভবনের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা করে অনেক টাকার মালিক হন শাহেদ। পরে প্রতারণা মামলায় ১/১১-এর ফখরুদ্দীন সরকারের সময় তিনি দুই বছর জেলে ছিলেন।

জেল থেকে বের হয়েই মেজর (অব.) ইফতেখার করিম চৌধুরী নামে ২০১১ সালে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর রোডে ‘বিডি ক্লিক’ নামে এমএলএম কোম্পানি খুলে কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর ২০১৪ সালে আবার প্রকাশ্যে আসেন। আবার শুরু করেন নতুন নতুন কৌশলে প্রতারণা। তার প্রতারণার খপ্পর থেকে বাদ যাননি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বজনরাও।

সেনাবহিনীর সাবেক কর্নেল পরিচয়ে মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক বিমানবন্দর শাখা থেকে ৩ কোটি টাকা নিয়ে আর ফেরত দেননি শাহেদ। এ সম্পর্কিত ২টি মামলা আদালতে বিচারাধীন। প্রতারণার টাকায় সাহেদ উত্তরা পশ্চিম থানার পাশে গড়ে তুলেছেন রিজেন্ট কলেজ ও ইউনির্ভাসিটি, আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটি যদিও এর একটিরও কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই।

আর অনুমোদনহীন আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটির ১২টি শাখা করে হাজার হাজার সদস্যের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর আগেও তিনি উত্তরা ৪, ৭ ও ১৩ নম্বর সেক্টরে ভুয়া শিপিংয়ের ব্যবসা করেছেন। সেই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামেই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ধানমন্ডির সেই বিডি ক্লিক থেকে রিজেন্ট হাসপাতাল। শাহেদ তার প্রতিটি অফিসেই সুন্দরী রমণীদের নিয়োগ দিতেন। অনেক প্রভাবশালীকে নিজের অফিসে এনে সুন্দরীদের দিয়ে বাগিয়ে নিতেন বড় বড় কাজ। তাদের অনেকের সঙ্গে শাহেদ সুন্দরী নারীদের দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতালের অপকর্মের দায়ে গ্রেফতারদের কাছ থেকেও শাহেদের ভয়ঙ্কর অপকর্মের তথ্যে রীতিমতো বিস্মিত র‌্যাব।

করোনা টেস্ট না করে সার্টিফিকেট দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে করা মামলায় সাতজনকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি অন্য একজনকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রতারণার মূল হোতা শাহেদ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে। পূর্বপশ্চিম

 

ভুলুয়াবিডি/এএইচ

নিউজটি শেয়ার করুন।