লক্ষ্মীপুরে ‘মাহমুদুল হাসান’র করোনা জয়ের গল্প

প্রকাশিত: ১:৪০ পূর্বাহ্ণ, জুন ১২, ২০২০

বিশ্বব্যাপী করোনা (কোভিড-১৯) সংক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে প্রতিদিন। এ পর্যন্ত এই করোনাভাইরাসটির ভ্যাকসিন হাতের নাগালের বাহিরে। করোনার নিষ্ঠুরতায় আক্রান্ত হলে প্রিয় মানুষটির কাছেও আসা নিষেধ প্রিয় স্বজনদের।

এমন পরিস্থিতিতে বিয়ের মাএ তিন মাসের মধ্যে করোনা উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েই যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন ঢাকা বাংলা মোটর এলাকার ব্যবসায়ী এবং লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান।

জানা গেছে, ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান গত কয়েক বছর থেকে ঢাকা বাংলা মোটর এলকায় বাংলাদেশ সিরামিক সিটিতে বাংলাদেশ ট্রেড নামে সিরামিক (টাইলস) ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত।

এদিকে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে চট্টগ্রামে তার বিয়ে ঠিক হয়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারী বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। পরিবারের সবাই, নিকট আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনসহ সবাই মিলে অনেক আনন্দ করে অনুষ্ঠিত হয় বিয়ে।

বিয়ের পর কতই না ব্যস্ততা। নতুন বউকে নিয়ে ঘোরাঘুরি তার পরে হানিমুন। হানিমুনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কক্সবাজার। হানিমুন শেষ করে ভালোভাবে বাড়িতে ফেরা হয় স্বামী-স্ত্রী দুজনের। এরই মধ্যে করোনার সংক্রমণ লাভ করতে থাকে। দেশ জুড়ে দেওয়া হয় সাধারণ ছুটি।

সাধারণ জুটির কারণে হানিমুন শেষে বাড়ি এসে তিনি আর ঢাকায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারেনি। সরকারের এ ঘোষণা অনুযায়ী করোনার সংক্রামন প্রতিরোধে লক্ষ্মীপুরে নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন ব্যবসায়ী মাহমুদ।

বাড়িতে অবস্থান করার সময় তিনি তার পরিবারের কেউ প্রয়োজন ছাড়া তেমন একটা বাড়ি থেকে বাহির বের হননি। প্রয়োজনের তাগিদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাহিরে চলাচল করে।

এরই মধ্যে জীবন-জীবিকার তাগিদে ঈদের আগে সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে সরকার সীমিত পরিসরে গত ১০ মে সাধারণ ছুটি শিথিল করেন।

সরকার সাধারণ ছুটি শিথিল করায় ব্যবসায়ীক প্রয়োজনে মাহমুদ গাড়ি ভাড়া করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে যান ঢাকায়। ঢাকায় গিয়ে ২-৩ দিন নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার সময় নিজেকে অসুস্থ বোধ করেন মাহমুদ।

এদিকে কাছের মানুষদের বিষয়টি জানিয়ে আবারো গাড়ি ভাড়া করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে আসেন বাড়িতে। বাড়িতে আসার সময় পথে তিনি নিজেকে আরো বেশি অসুস্থ বোধ করেন। পরে বাড়িতে এসে সাথে সাথে চলে যান লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে।

হাসপাতালে গিয়ে কোনো কিছু গোপন না করে সবকিছু খুলে বলেন চিকিৎসককে। করোনাভাইরাসের উপসর্গ শরীর ব্যথা ও জ্বর থাকায় চিকিৎসক তার নমুনা সংগ্রহ করে তাকে হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইন ইউনিটে ভর্তি করেন। এরপরে তার নমুনায় করোনা পজেটিভ আসে।

নমুনায় পজেটিভ আসার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের করোনা ইউনিটে। সেখানে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেন ব্যবসায়ী মাহমুদ। তিনি সুস্থ্য হওয়ার পরে তার সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের সাথে, তিনি তুলে ধরেন তার করোনা জয়ের অভিজ্ঞতা।

আলাপে ব্যবসায়ী মাহমুদ বলেন, ঢাকায় যাওয়ার ২-৩ দিন পর রাতে প্রথমে একটু জ্বর-জ্বর অনুভব হয় সাথে শরীরে ব্যথাও ছিল। জ্বরটা আসার সময় মাথা ব্যাথা করে।

অন্যান্য সময় যে জ্বর হয়, এর চেয়ে এটা একটু ব্যতিক্রম। এ সময় শরীরে কেমন যেন লাগতে থাকে। তখন সবাইকে ফোন করে বললাম আমারতো করোনা হয়েছে মনে হয়।

সবাই ভাবছে আমি দুষ্টুমি করছি। পরদিন আর দোকানে গেলাম না। বাসায় থেকেই কিছু কাজ করলাম। কিন্তু জ্বর থাকলো তারপর মনে হলো আস্তে আস্তে শরীর খারাপের দিকে যাচ্ছে। শরীরে ব্যথাও ছিলো।

আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। তখন তারা আমাকে বলল ‘তুই করোনা পরীক্ষা কর।’ শরীর খারাপ থাকায় ঢাকায় পরীক্ষা না করে জ্বর ও শরীর ব্যাথার ওষুধ খেলাম।

পরে এক বন্ধুর সহযোগিতায় একটি গাড়ি ভাড়া করে রাতে বাড়ির উদ্যেশে রওয়ানা হলাম। আমার কারণে যেন অন্য কেউ আক্রান্ত না হয় সে জন্য মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস পড়ে গাড়িতে উঠলাম।

পথে তেমন একটা শরীর খারাপ হলোনা কিন্তু ভোর রাতের দিকে শরীর আবার খারাপ হয়ে গেল। বাড়িতে এসে শরীর আরো খারাপ হয়ে যায়। তাই বাড়ির সবার কথা চিন্তা করে বাড়িতে আর অবস্থন না করে চলে যাই সদর হাসপাতালে।

হাসপাতালে গিয়ে কোন কিছু গোপন না করে চিকিৎসকের কাছে সব কিছু খুলে বলি। চিকিৎসক আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইন ইউনিটে ভর্তি করান ও নমুনা সংগ্রহ করেন।

নমুনা সংগ্রহের চার দিন পর আমার করোনা পজেটিভ আসে। করোনা পজেটিভ আসার পর যেহেতু আমার বাড়িতে হোম আইসোলেশনে থাকার ব্যবস্থা আছে তাই আমাকে হোম আইসোলেশনে থাকার কথা বলা হয়।

কিন্তু বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ মা-বাবার কথা চিন্তা করে আমি হাসপাতালের করোনা ইউনিটের আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকার কথা বলি। পরে আমাকে হাসপাতালের করোনা ইউনিটের আইসোলেশন ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি বলেন, করোনা পজেটিভ শোনার পর আমি প্রথমে একটু ভয় পেয়েছি। মনের মধ্যে একটা দুর্বলতা কাজ করতো। মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়লাম। আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার বন্ধুদের ফোন দেই, তখন তারা আমাকে আশ্বাস ও সাহস দিলো। বাসা থেকে আমার স্ত্রী আমাকে ফোন দিয়ে মনোবল বৃদ্ধি করলেন। লোকাল থানা খোঁজ খবর নিয়ে আমাদের বাড়ি লকডাউন করে দিল।

ব্যবসায়ী মাহমুদ বলেন, হাসপাতালে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে গরম পানির ভাপ নিয়েছি ঘন্টায়-ঘন্টায়। লবণ পানি দিয়ে গরর্গল করেছি। নিয়মিত গরম পানিতে লেবু যোগ করে, আদা দিয়ে গ্রিন-টি সেবন করেছি।

আমার করোনার উপসর্গ জ্বর, খুসখুসে কাশি, পেট খারাপ ও শরীর ব্যাথা ছিল। এসব উপসর্গ নিয়েই আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা চালিয়ে গেছি। ডাক্তারের পরামর্শে আমি নিয়মিত উপসর্গ গুলোর ওষুধ সেবন করেছি। দ

মধু ও কালোজিরা খেয়েছি নিয়মিত। ভিটামিন সি জাতীয় খাবার যেমন- মাল্টা, কমলা এবং জিংক সমৃদ্ধ খাবার খেয়েছি। তবে একটু পরপর নাকে মুখে গরম পানির ভাপ নিয়েছি। আর এটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ছিল।

গরম পানি পান করেছি। আদা, লেবু এগুলোও খেয়েছি। আমি প্রতিদিন গোসল করেছি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থেকেছি। বাসার সবাই ও আমার বন্ধুরা সব সময় আমার খোঁজ নিতেন। এছাড়া ডাক্তাররা প্রতিনিয়ত আমার খোঁজ-খবর রাখতেন।

সমপ্রতি পরপর দুইবার নমুনা সংগ্রহ করা হলে দুটোর ফলাফলই করোনা নেগেটিভ আসে। আল্লাহর রহমতে আমি এখন সুস্থ। সুস্থতার জন্য আমি মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।

মাহমুদুল হাসান বলেন, করোনা রোগকে কেউ অভিশাপ না ভেবে সহযোগিতার হাত বাড়ান। আক্রান্তদের মনোবল বৃদ্ধি করেন ও তাদের সব সময় উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করুন।

প্রতিবেশীরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে করোনা রোগীর সাথে দেখা করে মনোবল বৃদ্ধি করা যায়।

এ রোগে আতঙ্কিত না হয়ে একটু সচেতন ও সতর্ক থাকাই পারে সুস্থতা এনে দিতে। এর পাশাপাশি আমাদের সবার নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ও সতর্কতাই পারে করোনাভাইরাস রোধ করতে। ইউনাইটেডনিউজ

 

ভুলুয়া বাংলাদেশ/এমএএইচ