লক্ষ্মীপুরে জোয়ারের পানি সরতেই নতুন করে ভাঙছে মেঘনা নদী

লক্ষ্মীপুরে জোয়ারের পানি সরতেই নতুন করে ভাঙছে মেঘনা নদী

প্রকাশিত: ৮:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৯, ২০২০

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: কয়েক দিনের বৃষ্টি ও অস্বাভাবিক জোয়ারে লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় এলাকার নিম্নাঞ্চলে ডুকছে পানি। পানি সরতেই নতুন করে ভাঙছে মেঘনা।

মেঘনা নদী গর্ভে তলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, বসতভিটা, ফসলি জমিসহ নদী গর্বে হারিয়ে মিলছেনা স্থায়ী ঠিকানা। দ্রুত বেড়ি বাঁধ সংস্কার করে রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় বসবাসকারী লক্ষ্য জনতার স্বপ্নসাধ ও বসতবাড়ি রক্ষা করার জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্থতা।

এদিকে স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে গত কয়েক দিনে নদীতে প্রায় ৫ ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। আর বুধবার বিকালে অস্বাভাবিক জোয়ারে লক্ষ্মীপুরে উপকূলীয় মেঘনা নদীর তীরবর্তী প্রায় ৪০ টি গ্রাম জোয়ারে প্লাবিত হতেই পানিতে ডুবে মারা গেছে কমলনগর উপজেলায় এক ব্যবসায়ীর পোল্ট্রি খামারের সাড়ে ৫ হাজার মুরগী।

এছাড়া কয়েকদিনে অস্বাভাবিক জোয়ারে পানি প্রবেশ করে হাঁটু পরিমাণ পানিতে ডুবে জোয়ারে ভেসে গেছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমনী মোহন, রামগতি, কমলনগর, রায়পুরসহ ৪টি উপজেলায় প্রায় অর্ধকোটি টাকার মাছ। ভেসে গেছে মাছের ঘের, পুকুর ও ডোবার মাছ।

সেই জোয়ারের পানি সরতেই রাস্তাঘাট ভেঙ্গে এখন নতুন করে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমনী মোহন এলাকা সহ রামগতি উপজেলার বালুরচর, সুজন গ্রাম, বাংলা বাজার, আসলপাড়া, আলেকজান্ডার ইউনিয়ন সোনালী গ্রামসহ কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি,চর ফলকন, সাহেবের হাট,পাটোয়ারীর হাট এলাকা ভাঙছে মেঘনায়।

‘‘ক’দিন আগেও বসতভিটায় ছেলে মেয়ে নিয়ে বাস করতো তারা। মেঘনার ছোবলে একদিনে তছনছ হয়ে যায় তাদের সহায় সম্বল’’। এখন কোন রকমে খুপড়ি ঘরের চালাগুলো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রাখাসহ থাকতে হচ্ছে আত্মীয়-স্বজন এর বাড়ীতে। তাও যাচ্ছে ভেঙে। এবং দিনাতিপাত করছে অসহায় মানুষগুলো। এরকম দু’শর বেশি পরিবারের জীবন উদ্বেগ-উৎকন্ঠায়।

জীবিকা উপার্জনের শেষ সম্বল ভিটে বাড়ী আর ফসলি জমিও কেড়ে নিয়েছে মেঘনা। এ ব্যাপারে কথা হয় ৫০ বছরের বয়সী রামগতি বাসিন্দা সুজন গ্রামের ফুলজান বিবির সাথে।

জানান, কয়েকবার বসতঘর ভেঙেছে মেঘনা। এ বার ভাঙ্গনে জুটে ছিলো আত্মীয়ের বাড়ীতে আশ্রয় তাও গেছে ভেঙে। এখন ঠিকানা নেই, রাত কাটে রাস্তার পাশে খুপড়ি ঘরে। সরকারি ত্রাণসহায়তার কথা শুনেছেন, তবে বাস্ততা দেখা হয়ে ওঠেনি তার ‘‘এমন কথা বলতেই মনের আক্ষেপে কেটে ওঠেন ফুলজান বিবি।

দেখা মিলে একই সড়কে বসবাসরত ৮০ বছরের ওসিউল মিয়ার সাথে ‘‘তিনি হয়তো স্থানীয় সংসদ সদস্যকে পেলে বলতেন আক্ষেপের কথা। ১ বছর পরও সংসদ সদস্যের দেখা না পেয়ে শুনতে হলো ওসিউল্যার ওসিয়তি কথা।

তিনি বলছেন, ‘‘আনগো বড় বড় নেতৃত্বনেতারা আছে তারা আনগো দিকে একানা চায়না। আজ আমরা সাগরে বাসি। আগে এলাকায় মোটামুটি অবস্থাপন্ন একটি পরিবারে ছিলাম। ভাঙ্গনে নদী শত্রুতায় নিঃস্ব করেছে কয়েকবারে”।

“এখন তো আমাদের যে পরিস্থিতি,আগে আমরা দু’বেলা ডাল-ভাত ভালভাবেই খেতাম। এখন আমাদের খাওয়া দাওয়াই মুশকিল যাচ্ছে। বলতে গেলে পথের ভিখারি।
‘‘রামগতি বাঁধের পাশের বাসিন্দা আরেকজন নারী ছালেহা বেগম জানান, তিন বছর আগে ভিটেমাটি হারা হন তিনি। আশ্রয় নেন চরগাসিয়া এলাকায়।

এক বছরের ব্যবধানে সেই আশ্রয়টিও কেড়ে নেয় মেঘনা। চলে আসতে হয় বয়ারচরে। দুই বছরের মাথায় আবারও ভাঙনের মুখে পড়েছেন। জেলে পরিবারের স্বামী ও চার সন্তান নিয়ে পরবর্তী যাত্রা কি হবে কোথায় হবে ঠিকানা এখন শুধু অনিশ্চিত!!’’ আর এর মধ্যে লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীর ভাঙ্গন তীর্ব আকার ধারণ করেছে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেছেন, সংসদ সদস্য আ’লীগের দলীয় সাংসদ না হওয়ায় উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারের উন্নয়নে কোন কাজ করেননি। দলীয় সংসদ সদস্য হলে হয়তো এ এলাকার মানুষের খবর রাখতেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাইয়ুম বলেন, পুরো বায়ারচর এবং এর আশপাশে প্রায় তিন লাখ লোকের বসবাস। বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্থ হলে তার প্রভাব পড়বে এ সকল লোকের উপর। কেউ ভিটে মাটি হারা হবে, আবার কারো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাঁধটি ভেঙে গেলে জোয়ারের পানি ঢুকে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হবে।

তিনি বলেন, বায়রচরের বাসিন্দারা দুই জেলার বিতর্কিত সীমান্তে হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন তাদের দিকে নজর দিচ্ছেনা। ফলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধ মেরামতের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এতে সবুজ বেষ্টনি ঘেরা বয়ারচর রক্ষা বাঁধটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে ভিটেমাটি হারাচ্ছে ওই এলাকার বাসিন্দারা। ভাঙন আতঙ্কে আছে কয়েকশ পরিবার।

তিনি আরও বলেন, বাঁধটি মেরামতের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এ এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার রামগতির। টেকসই প্রকল্পের মাধ্যমে সিসি ব্লক দিয়ে বাঁধটি মেরামতের জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং স্থানীয় সাংসদ মেজর (অব:) আবদুল মান্নানের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।

আলেকজান্ডার স্থানীয় চেয়ারম্যান মো,আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, লক্ষ্মীপুরে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মেঘনার ভাঙ্গনরোধে স্থায়ী বেড়ীবাঁধ নির্মাণের দাবিতে রামগতি উপজেলা পরিষদের সামনে এ মানববন্ধন কর্মসূচি করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মোমিনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট স্বারকলিপি প্রদান করেন তারা।

লক্ষ্মীপুর জেলা দায়িত্বরত পানি উন্নয়ন বোর্ড উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এম এম জাহাঙ্গীর জানিয়েছেন, জরুরি ভিত্তিতে রামগতির কয়েকস্থনে ভাঙন রোধে কাজ করা হবে।এছাড়া ভাঙ্গন প্রতিরোধে ৩১ কিলোমিটারের জন্য ৩২ শত কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেটি একনেকে অনুমোদন পেলে পুরোধমে কাজ শুরু হবে।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান এর সাথে যোগাযোগ চেষ্টা করে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

 

ভুলুয়াবিডি/এএইচ

নিউজটি শেয়ার করুন।