লক্ষ্মীপুর মুচলেকা দিয়ে বৃদ্ধ বাবাকে ঘরে তুলেছে ছেলেরা

প্রকাশিত: ৭:৩০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২১

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরের মেঘনা রোডের বাসিন্দা বৃদ্ধ সফিকুল ইসলাম। বয়স এখন ৯৫। চার ছেলে এবং তিন মেয়ের পিতা সফিকুল ইসলাম। ছাপাখানায় কাজ করতেন সফিকুল। দু’বছর আগে ৪ ছেলে এবং ৩ মেয়েকে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়েছেন।

ছেলেদের সবার অবস্থা ভালো। তবে কয়েক বছর আগে মারা যায় এক ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন বৃদ্ধ সফিুকুল ইসলাম। কিন্তু বৃদ্ধ পিতা সফিকুল ইসলামের ঠাঁই নেই নিজের সন্তানদের কাছে।

অসুস্থ বাবার দায়িত্ব ও পরিচর্যার অপারগতা জানিয়েছেন, ছেলে সন্তানরা। শুক্রবার (১০ জুলাই) ভোরের দিকে অসুস্থ বাবাকে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখে সন্তানরা। এ ধরনের ঘটনার পর এলাকার লোকজন প্রশাসনকে খবর দিলে নির্বাহী হাকিম রাসেল ইকবাল এবং রাজীব হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে বিস্তারিত শুনে ছেলেদের বাবার দায়িত্ব নিতে বলেন।

কিন্তু সন্তানরা কেউ বাবাকে নিতে রাজি না হওয়ায়, অসুস্থ সফিকুলকে বড় মেয়ে সুরাইয়া তার বাবাকে নিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি করে অসুস্থ শফিকুলকে মেয়ে সুরাইয়ার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, লক্ষ্মীপুর পৌর মেঘনা রোডের বাসিন্দা বৃদ্ধ সফিকুল ইসলাম ৯৫ বছরে এসে সন্তানদের অনাদরের বলি হয়েছেন। তার নিজের সম্পত্তি সন্তানদের ভাগ করে দেয়ার পর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সন্তানদের বাড়ির দরজায় খোলা আকাশই হয়েছে আশ্রয়স্থল।

বিষয়টি স্থানীয়সহ সকল মানুষের মাঝে হৃদয়ে নাড়া দিলেও সন্তানরা তাদের বৃদ্ধ পিতাকে ঘরে না তোলার সিদ্ধান্তে তখনও অটুট। শুক্রবার বিকেলে সাড়ে চারটা থেকে দুই ঘন্টা ধরে ছেলে ও প্রতিবেশীদের নিয়ে বৈঠক করেন সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মামুনুর রশিদ।

বিষয়টি তদারকির জন্য পৌরসভার কাউন্সিলর গোলাম মোস্তফা পাটওয়ারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে শুক্রবার বিকালে বিষয়টি বিস্তারিত শুনে জেলা প্রশাসক কার্যালয় নির্বাহী হাকিম রাসেল ইকবাল ও রাজীব হোসেন ছেলেদের বাবার দায়িত্ব নিতে বললে তারা কেউ রাজি হননি।

স্থানীয় এলাকাবাসী তানজিমুল হাসান তুষার জানান, বাবা মা কষ্ট করে সন্তানদের বড় করেছেন। সন্তানদেরও উচিৎ সে বয়সে বৃদ্ধ পিতামাতাকে দেখাশুনা করা।পিতার সম্পত্তি ভাগ বুঝে নেওয়ার পরই পিতা মাতা যেন সন্তানের নিকট ফেলনা না হয়ে যায়। যে ঘটনাটি ঘটেছে সেই ঘটনা সম্পূর্ণ অমানবিক ও ক্ষমার অযোগ্য দাবী করে এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

অন্য স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সকলের উর্দ্ধে পিতা মাতা। আর পিতার টাকা পয়সা থাকুক কিংবা না থাকুক তার দায়িত্ব সন্তানদের উপর। কিন্তু শুক্রবার যে ঘটনা তারা দেখছে তা বিশ্বাস করতে পারছে না উল্লেখ করে বলেন, এ সমাজে কিছু খারাপ সন্তান রয়েছে। তারা পিতার সম্পত্তি পাওয়ার পর পিতাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। এই রকম ঘটনাগুলোর সমাজে দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে’।

বৃদ্ধ সফিকুল ইসলামের মেয়ে সুরাইয়া বেগম জানান, ভাইদের মাঝে তার বাবা ইতোপূর্বে তার সব সম্পত্তি লিখে দিয়েছেন। যার কারণে এখন তার ভাইয়েরা এবং তাদের স্ত্রী সন্তানরা তার পিতাকে বোঝা মনে করছেন। মূলত পিতার সম্পত্তিগুলো ভাগ করে দেয়ার কারনেই এমন নির্মম ঘটনা ঘটেছে বলে জানান সুরাইয়া বেগম।

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী হাকিম রাসেল ইকবাল বলেন, ‘বৃদ্ধ লোকটি অসুস্থ হওয়ায় কোন ছেলে রাখতে চাচ্ছে না। তাই তারা বাড়ির বাইরে ফেলে রেখেছিলো। পরে অসুস্থ সফিকুলের এক মেয়ে এসে তার দায়িত্ব নিতে চাইলে মেয়ের বাড়িতে পাঠানো হয়’

এই ঘটনার পররপর নানান চাপে শনিবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যায় টনক নড়েছে ছেলেদের। বাবার সেবা যত্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুচলেকা দেয় বৃদ্ধার দুই ছেলে। এখন আশ্রয় জুটেছে ছোট ছেলের ঘর আলমগীর হোসেন এর স্বপ্ন মহলে।

 

 

ভুলুয়াবিডি/এএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন।