সমাজ চলছে নিবারণের ‘উন্নত’ পন্থা

প্রকাশিত: ৭:৪৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২০

সংসারে মন্দ আছে যেমন, তেমনি ভালোও আছে। ভালোর সংখ্যাই অধিক, নইলে সংসার চলে কী করে। তবে ভালোরা দুর্বল, মন্দরা প্রবল। তাই মন্দরাই রাজত্ব করে। শিশুদের দেখেছি ভালো ও মন্দকে খুব পরিস্কারভাবে ধরে ফেলে এবং সবকিছুতে ওই দুই ভাগে ভাগ করে নেয়।

তাদের কাছে ভালো যদি না হয়, তাহলে অবশ্যই মন্দ। মাঝখানে কিছু রাখে না। কবি মুহম্মদ ইকবাল প্রায় সমাজতন্ত্রীই ছিলেন, কিন্তু ধর্মকে ছাড়তে পারেননি। সে জন্য লিখেছেন, স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে কেন তফাৎ? মধ্যবর্তী মোল্লাকে আজ হাঁকিয়ে দাও।

কিন্তু মধ্যবর্তীকে হাঁকিয়ে দেওয়া যায়নি। তারা আছে। এই মধ্যবর্তীদের নানা চেহারা, এরা কেউ মধ্যস্বত্বভোগী, কেউ দালাল। আর অত্যন্ত ভদ্র যারা, তারা উদারনীতিক।

শিশুর কথা বলছিলাম। বিশ্বসভ্যতা অতি অদ্ভুত এক উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছেছে। একেবারে থুরথুরে বৃদ্ধ না হোক, প্রাপ্তবয়স্ক তো বটেই। কিন্তু করোনাভাইরাসের ঐতিহাসিক আক্রমণ এক ধাক্কায় বিশ্বের সব মানুষকেই একেবারে শিশু বানিয়ে ছেড়েছে। সদ্যজন্মপ্রাপ্ত শিশুটি যেমন মাতৃগর্ভের নিরাপত্তা হারিয়ে কাঁদে,বয়স্করা এখন কাঁদুক বা না কাঁদুক- নিদারুণ নিরাপত্তাহীনতায় যে ভুগছে, তাতে সন্দেহ কী।

বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের অবশ্য নিরাপত্তাহীনতা সব সময়ই অধিক ছিল, এখন মানবসভ্যতার এই অবিশ্বাস্য উন্নতির কালেও শিশুদের নিরাপত্তা যে বেড়েছে, এমন নয়। করোনাকালে সবচেয়ে অনিরাপদ অবস্থায় রয়েছে শিশুরা।

শিশুর যত্ন সবার আগে প্রত্যাশিত তার মা’র কাছ থেকেই। সেই মায়েরা নিজেরাই খুব বিপদের মধ্যে পড়েছে। অতি আধুনিক শহর নয়াদিল্লি, সেখানে ক’দিন আগের খবর- ৮৬ বছরের একজন নারী ধর্ষিত হয়েছেন এক যুবকের দ্বারা। বাংলাদেশের অবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলেছে, করোনাকালে নারী ও শিশু নির্যাতনের সব খবর মিডিয়ায় আসছে না; পরিষদের কাছে খবর আছে যে এ সময়ে নির্যাতন বেড়েছে।

দিল্লি ও বাংলাদেশের উভয় ঘটনাই স্বাভাবিক। করোনার সময়ের কর্মহীনতা, হতাশা, আনন্দহীনতা, আবদ্ধদশা- সবকিছুই মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে আদিম হিংস্রতার দিকে। রিপুগুলো সব সক্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষভাবে লকলকিয়ে উঠেছে পুরুষ মানুষের কাম, ক্রোধ ও লোভ। আর এর সহজ শিকার হচ্ছে নারী।

নারী নির্যাতনের মতোই শিশু নির্যাতন অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। উন্নতির স্তরে স্তরে শিশুশ্রমের ক্রন্দন ও ঘাম চাপা দেওয়া রয়েছে। কিন্তু নতুন যা যোগ হয়েছে তা হলো শিশু ধর্ষণ। ধর্ষণ করছে এবং সাক্ষী না রাখার জন্য ধর্ষিত শিশুটিকে হত্যা করছে।

বাংলাদেশে এ জিনিস কিছুদিন আগেও অজানা ছিল; এখন এটা নিত্যদিন যখন তখন যেখানে সেখানে ঘটছে। এই লেখাটি তৈরি করতে করতেই খবর দেখলাম, টাঙ্গাইলে ১০ বছরের একটি শিশুকে প্রথমে ধর্ষণ ও পরে হত্যা করে ঝোপের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সিঁদ কেটে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ঘরে ঢুকেছিল চুরির উদ্দেশ্যে। চুরি কিছুই করেনি, মোবাইল ফোনটাও নয়, নিদ্রিত কর্মকর্তাকে হত্যা করার জন্য শুধু হাতুড়ি ব্যবহার করেছে। ‘উন্নতি’ ঘটছে বৈকি। বাংলাদেশে মানুষের জন্য নিরাপত্তা আজ কোথাও নেই। পথে-ঘাটে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক।

অনেক মানুষেরই ঘর নেই; যারা ঘরে থাকে, তারাও নিরাপদে ঘুমাতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ফুল বিক্রি করত গৃহহীন যে শিশুটি, তাকে পাচারের জন্য যে সুশিক্ষিত নারী তৎপর হয়েছিলেন, তিনিও তার কাজের মধ্য দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে উপার্জনের জন্য শিশু নির্যাতন খারাপ পন্থা নয়।

যে শিশুরা কোনোমতে বেঁচেবর্তে কিশোর হয়, তাদের অবস্থাটা কী? কোথায় তাদের খেলার মাঠ, নাটকের মঞ্চ, বই পড়ার পাঠাগার, চলবার-ফিরবার পরিসর? এসব জিনিস এককালে অল্পস্বল্প যা কিছু ছিল, এখন তা অতীতের সুখস্মৃতিতে পরিণত। কিশোর আন্দোলনও ছিল।

ছিল মুকুল ফৌজ, খেলাঘর, কচিকাঁচার মেলা, চাঁদের হাট- সেসব কোথায় গেছে চলে! একালের ছেলেমেয়েরা শুনলে মনে করবে গালগল্প। তা কোথায় গেল ওই সব আন্দোলন? কেন গেল চলে? গেল কিন্তু উন্নতির কারণে। উন্নতি মাঠ-ময়দান সব দখল করে নিয়েছে। উন্নতি শিশুকে সমাজবিচ্ছিন্ন করেছে।

উন্নতির সাম্প্রতিক আওয়াজ আইসোলেশন। উন্নতির চূড়ান্ত প্রকাশ ও প্রকোপ করোনাভাইরাস, যার হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ঘরের (যদি থাকে) ভেতর লুকিয়ে থাকা। মুখে মুখোশ পরে থাকা। আগে চোর-ডাকাত-খুনিরা ওই জিনিস পরত।

কিশোররা এখন কী করে? হতাশায় ঝিমায়, স্বপ্ন দেখার লোভে মাদক সেবন করে, কে সিনিয়র কে জুনিয়র বিতর্কে মত্ত হয়ে খুনোখুনি করে, গুরুজনদের নির্দেশে হত্যা করে নারায়ণগঞ্জের কিশোর ত্বকীকে। আর কী করে? তাদের বিনোদন কী? তার একটি নমুনা করোনাকালেই পাওয়া গেছে। মদ খেয়ে মারা যায়।

ঘটনা পাবনা অঞ্চলের, ব্রিটিশ আমলে যে অঞ্চল কৃষক আন্দোলনের জন্য বিখ্যাত ছিল বলে উল্লেখ আছে বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন পত্রিকায়, সেখানে বোনের জন্মদিনের উৎসবে আনন্দফুর্তি উপলক্ষে অতিরিক্ত মদ্যপানে দুই কিশোর প্রাণ হারিয়েছে। ওই এলাকায় মাদক অবাধে বিলি-বিক্রি হয়,যেমন হয় অন্য অনেক এলাকায়ও। হতে পারে এ দুই কিশোরও ওই ব্যবসায় যুক্ত ছিল; এমন খবর হামেশাই পাওয়াও যাচ্ছে।

তুলনামূলকভাবে এগুলো তত ভয়ংকর নয়, যত ভয়ংকর কিশোর গ্যাং-এর তৎপরতা। কিশোর আন্দোলন নিশ্চিহ্ন হলেও পাড়ায়-মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। তাদের তৎপরতা কমছে না; বাড়ছে। কিশোর গ্যাং কী করে? নিজেদের মধ্যে ছুরি চালাচালি করে, খুন হয়। সংঘর্ষ বাধলে শীতলক্ষ্যায় ঝাঁপ দেয়, পরে লাশ হয়ে ভেসে ওঠে। আরও কাজ আছে তাদের। যেমন-

দিনাজপুরে শালবনে ‘বন্ধুকে বেঁধে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ’। অথবা কিশোরগঞ্জে ‘প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাত’। কোনো খবরই নতুন নয়। তবে করোনাকালে অন্য অনেক কিছু কমলেও এগুলো একটুকুও যে কমেনি, সে ব্যাপারটাই তাৎপর্যপূর্ণ।

মামলা-মোকদ্দমাও চলছে। যেমন- ‘কিশোর গ্যাং-এর ১৬ নেতার ঘাড়ে খুনসহ শতাধিক মামলা’। সংবাদপত্রেরই সংবাদ। তবে এদের ঘাড় এরই মধ্যে যথেষ্ট পোক্ত ও প্রশস্ত হয়ে গেছে। ফলে পরোয়া করে না। জামিনে থেকে অথবা জেলখাটা শেষে আবারও তৎপর হয় এবং তৎপর থাকে, যতক্ষণ না মৃত্যু ঘটে। আমৃত্যু সাধনা।

কিশোররা কি ভালো কাজ করে না? অনেকেই করে, কিন্তু সেসব প্রচার পায় না। ভালো কাজগুলো আলো-বাতাসের মতো, তারা মিশে যায়, মিশে থাকে; খারাপ কাজগুলো গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার, তারা দুষ্ট বাতাস, তারা নাড়িয়ে দেয়। তারা সংক্রামক। আমরা টের পাই। অন্যের অপকর্মে বাধা দিয়েছে কিশোর, দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে, এমন ঘটনাও ঘটে। ঘটেছে এই করোনা সময়েই।

কিশোররা যে ভালো কাজ কতটা করতে পারে, দেখেছি তা অতীতের ছাত্র-আন্দোলনে। দেখেছি মুক্তিযুদ্ধে। দেখেছি কিছুদিন আগে ঢাকা শহরে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনায় তারা যখন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিল, তখনও। স্বেচ্ছাসেবী কিশোররা যান চলাচলে এমন শৃঙ্খলা এনে দিয়েছিল, তেমনটা বেতনভুক ও সুবিধাপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য দুঃসাধ্য।

আর সে জন্যই ওই ভালো কাজটিতে তারা টিকে থাকতে পারেনি। তাদের সরে পড়তে হয়েছে। এমনকি হয়রানির শিকার পর্যন্ত হতে হয়েছে। নীরবে এমন উচিত শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যেন আর কখনও ও-মুখো না হয়। তোমরা মাদক খাও ঠিক আছে, অল্প বয়স এদিক-সেদিক তো করবেই; তোমরা দাঙ্গা-ফ্যাসাদ করো তাও সহ্য, কিন্তু পুলিশের কার্যে হস্তক্ষেপ? তাহলে পুলিশ কী করবে?

আমরা যখন কিছুটা কম উন্নত ছিলাম, তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নামে একটি পরিসর ছিল। ছাত্র সংসদের কার্যক্রমে অংশ নিয়ে ছেলেমেয়েরা অনুশীলনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ পেত। পরে উন্নয়ন জোয়ার যখন চলে এলো, তখন দেখা গেল তার প্রপাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে।

পরিণামে দেখা গেল, অপরাধ ও সহিংসতার মারাত্মক বৃদ্ধি এবং সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের দোর্দণ্ড প্রতাপ, যার সাক্ষী সহপাঠীদের হাতে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরারের করুণ মৃত্যু। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন কাজে ছাত্রলীগের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের থাবা বসানোর প্রচেষ্টাও জানিয়ে দেয় যে, সরকারি দলের সঙ্গে থাকলে কী কী সুযোগ-সুবিধা হস্তগত করা সম্ভবপর।

বহু আলোচনা-সমালোচনা ও ক্রমবর্ধমান দাবির মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ পর্যন্ত দায়সারাগোছের ছাত্র সংসদের একটি নির্বাচন হয়েছে। তবে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক ছিল সরকার-সমর্থক ছাত্র সংগঠনের সদস্য।

দেখা গেল, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে সে তার নিজের সংগঠন থেকেই বহিস্কৃত হয়েছে। ভিপি হয়েছিল কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর। নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের সময়ে এবং নির্বাচনের পর সে শারীরিকভাবে প্রহূত হয়েছে। তার কার্যকাল শেষ হয়েছে; কিন্তু সে যেহেতু রাজনৈতিক দল খাড়া করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে, সে কারণেই হবে, তার বিপদ কাটেনি।

যুবকটি মামলা ও পুলিশি হয়রানির মুখে পড়েছে। নতুন মামলা ধর্ষণে সহযোগিতার। এ নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ-শিরোনামটি মনে হয় অযথার্থ নয় : ‘বিরোধী দলহীন’ মাঠে নুরই প্রতিপক্ষ (কালের কণ্ঠ, ২৩-০৯-২০)।

সম্প্রতি একটি প্রতিবাদ মিছিল থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকারি গোয়েন্দা দপ্তরে নিয়ে তাকে কী বলা হয়েছিল- এ প্রশ্নের জবাবে নুরুল হক এক সাক্ষাৎকারে বলেছে, ‘তাঁরা বলেছেন এসব বাদ না দিলে আরও ভয়াবহ পরিণতি হবে’ (প্রথম আলো, ২৪-০৯-২০)।

এরশাদ আমলে ছাত্র-আন্দোলনের মুখে ডাকসুর এক সাধারণ সম্পাদককে দলে ভেড়ানোর জন্য টানাটানি করা হয়েছিল। সরকার তাতে সফলও হয়েছিল। এখন চলে এসেছে নিবারণের আরও উন্নত পন্থা।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ভুলুয়াবিডি/এএইচ

নিউজটি শেয়ার করুন।